রবিবার, অক্টোবর ১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক: মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার। যে মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্থানটি সঠিকভাবে চিহ্নিত ছিল না। ফলে শহীদের স্মৃতিবিজড়িত সেই রক্তস্নাত স্থানে এতদিন আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো সুযোগ পাননি তাঁর সহযোদ্ধা বা স্থানীয়রা। অবশেষে সহযোদ্ধা ও স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘদিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় চিহ্নিত হয়েছে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের শাহাদাতস্থল।

রবিবার (৩০ আগস্ট) সকালে দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কুল্লাগড়া ইউনিয়নের আড়াপাড়া গ্রামে প্রথমবারের মতো সেই স্মৃতিবিজড়িত মাটিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দীর্ঘ ৫৫ বছর পর শহীদের স্মৃতিধন্য স্থানে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

এদিন সকালে বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ শহীদ আব্দুল জব্বারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ শেষে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। একইসঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী দেশের সকল বীর শহীদের জন্যও দোয়া করা হয়।

অনুষ্ঠানে আবেগজড়িত কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করেন সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব হোসেন তালুকদার। তিনি বলেন, “১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে আড়াপাড়া গ্রামের এই স্থানেই শহীদ হন আমাদের সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি সঠিকভাবে চিহ্নিত ছিল না। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সহযোদ্ধাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে স্থানটি চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “স্থানটি চিহ্নিত করার পর আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি অবগত করি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। আজ আমরা এখানে এসে প্রথমবারের মতো শহীদ আব্দুল জব্বারের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর তাঁর শহীদ হওয়ার স্থানে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারাটা আমাদের জন্য যেমন আবেগের, তেমনই পরম গর্বের।”

সম্মুখযুদ্ধের সেই ভয়াল দিনের স্মৃতিচারণ করে সোহরাব হোসেন তালুকদার বলেন, “আব্দুল জব্বার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। ওই দিনের সেই যুদ্ধে আমরা ১০ জন ছিলাম। তুমুল যুদ্ধের একপর্যায়ে আব্দুল জব্বার শহীদ হন এবং আমাদের আরও একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা বাকিরা বেঁচে যাই। আমি ওই যুদ্ধে তাঁদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলাম। সেই দিনের স্মৃতি আজও আমার মনে অমলিন হয়ে আছে।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মদন গোপাল শর্মা বলেন, “আগে এই জায়গাটি চিহ্নিত ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আব্দুল জব্বারের সঙ্গে যারা সরাসরি রণাঙ্গনে ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা ও স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমেই মূলত জায়গাটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এখন আমরা সব মুক্তিযোদ্ধা মিলে তাঁর শহীদ হওয়ার স্থানটি চিহ্নিত করতে পেরেছি, যা আমাদের জন্য বিরাট প্রাপ্তি।”

তিনি আরও বলেন, “এ বছরই প্রথমবারের মতো এখানে শহীদ আব্দুল জব্বারের জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি ও দোয়া করা হলো। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে প্রতিবছরই এই স্থানে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে বীর শহীদদের আত্মত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে এই স্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য বীর সন্তান দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের এই চরম আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা অনেক শহীদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান এখনও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। আড়াপাড়া গ্রামে শহীদ আব্দুল জব্বারের শাহাদাতস্থল চিহ্নিত হওয়া এবং সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ সৃষ্টি হওয়াটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক উদ্যোগ।

শ্রদ্ধাঞ্জলি ও দোয়া শেষে শহীদ আব্দুল জব্বারের রণাঙ্গনের ভূমিকা ও বীরত্বের স্মৃতিচারণ করে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁর অসীম সাহস, গভীর দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেন। উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের একটাই প্রত্যাশা- ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সঠিক ইতিহাস ও বীর শহীদদের আত্মত্যাগের গাথা তুলে ধরতে স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা হবে।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version