নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরী উপজেলার বানুয়ারী জুয়েল চৌধুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন ও সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বাধা প্রদান এবং অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে। গত সোমবার (২৪ আগস্ট) বিদ্যালয়ে পাঠদান ও পরীক্ষা চলাকালে সহকারী শিক্ষক ঝুটন চৌধুরী এ ঘটনা ঘটান বলে জানা গেছে। এ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওইদিন যমুনা টিভি ও দৈনিক যুগান্তরের জেলা প্রতিনিধি কামাল হোসেন, একুশে টেলিভিশনের প্রতিনিধি মনোরঞ্জন সরকার এবং খালিয়াজুরী প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক হাবিবুল্লাহসহ কয়েকজন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের জন্য ওই বিদ্যালয়ে যান। তারা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শুক্লা রাণী রায়ের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য ও ভিডিও সংগ্রহ করছিলেন।
একপর্যায়ে তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর কাছে বিদ্যালয়ের ‘মিড-ডে মিল’ (দুপুরের খাবার) বিষয়ে জানতে চাইলে উপস্থিত সহকারী শিক্ষক ঝুটন চৌধুরী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এক সাংবাদিকের হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং তথ্য ও ভিডিও সংগ্রহে বাধা দেন। পরে উপস্থিত অন্য সাংবাদিকরা ওই শিক্ষকের হাত থেকে মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করেন।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, সহকারী শিক্ষক ঝুটন চৌধুরী ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে বলেন, তার অনুমতি ছাড়া বিদ্যালয়ে কোনো ভিডিও ধারণ বা তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না। এমনকি তিনি এ-ও দাবি করেন, ‘‘এখানে বর্তমান সরকারের স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এলেও আমার অনুমতি নিয়ে বিদ্যালয়ে ঢুকতে হবে। কারণ আমি এই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।’’ এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে চরম অশোভন আচরণ করেন এবং প্রধান শিক্ষককে পুলিশ ডাকতেও বলেন।
তবে সাংবাদিকদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক ঝুটন চৌধুরী। তার দাবি, বিদ্যালয়ে তখন পরীক্ষা চলছিল। তিনি বলেন, “ভিডিও ধারণ করার সময় আমি তার (সাংবাদিকের) পরিচয় জানতে চাই ও আইডি কার্ড দেখাতে বলি। তিনি তা না করে উল্টো অশোভন আচরণ করায় আমি মোবাইল নেওয়ার চেষ্টা করি।” প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এটি সম্পূর্ণ ‘বানানো কথা ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও খালিয়াজুরী প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক হাবিবুল্লাহ শিক্ষকের আনীত পাল্টা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “শিক্ষক এখন নিজের দোষ ঢাকতে অনেক কথাই বলবেন। তিনি পরিচয় না জানার কারণে বাধা দিয়েছেন- এসব কথা ভিত্তিহীন।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শুক্লা রাণী রায় ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সাংবাদিকরা আমার অনুমতি নিয়েই বিদ্যালয়ে এসেছিলেন। জেলা প্রতিনিধিরা তখন আমার সামনেই বসা ছিলেন। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী হাবিবুল্লাহর সাথে ঘটে, যখন ঝুটন ক্লাসে পরীক্ষা নিচ্ছিলেন।”
তিনি আরও বলেন, “মিডিয়ার সংবাদকর্মীদের আর কোনো শিক্ষকের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সহকারী শিক্ষক ঝুটন চৌধুরীর আচরণের জন্য আমি দুঃখিত ও লজ্জিত এবং আমি আপনাদের (সাংবাদিকদের) কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেভাবে লেখালেখি হচ্ছে, তা হতাশাজনক।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. রতন মিয়া বলেন, “সাংবাদিকরা দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। তাদের কাজে শিক্ষকের বাধা দেওয়া মোটেও উচিত হয়নি। এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অন্যায়।”
এ ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
খালিয়াজুরী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজিমেল কদর বলেন, “সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। তারা যেকোনো সময় যেকোনো বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মহোদয়ের নির্দেশে অভিযুক্ত শিক্ষকের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তার জবাব পাওয়ার পর তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং বিধি মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “আমি বিষয়টি শুনেছি এবং এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে পুরো ঘটনাটি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে দোষী শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আহ্বান জানিয়েছেন।



