নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনা কলমাকান্দা উপজেলার রংহাটি ইউনিয়নে পানিশ্বরপাড়া গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে অতর্কিত হামলা, বাড়িঘর-দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো গোরস্থানের জমির মালিকানা ও দখলকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী আমগড়া ও নুল্লাপাড়া গ্রামের লোকজনের সঙ্গে বিরোধের জেরে গত ১৪ই আগস্ট সকালে এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে এ ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার পানিশ্বরপাড়া গ্রামে ভুক্তভোগী গ্রামবাসীর ব্যানারে মানববন্ধন কর্মসূচী পালিত হয়।
পানিশ্বরপাড়া গ্রামবাসীর ভাষ্যমতে, তাদের বাপ-দাদারা ৮০-৯০ বছর আগে জমি কিনে গোরস্থানটি ওয়াকফ করে দেন এবং তখন থেকেই এটি ‘পানিশ্বর পাড়া কবরস্থান’ নামে পরিচিত। সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী আমগড়া গ্রামের লোকজন গোরস্থানটির নাম পরিবর্তন করে আমপাড়া গ্রামের নামে করার চেষ্টা করে এবং জোরপূর্বক দখলের পাঁয়তারা চালায়। কয়েকদিন আগে এ নিয়ে সালিশও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কাগজপত্রের ভিত্তিতে পানিশ্বরপাড়া গ্রামবাসীর মালিকানা প্রমাণিত হয়। এরপরও আমগড়ার লোকজন নুল্লাপাড়ার কিছু বহিরাগত ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের উসকে দিয়ে পরিকল্পিত হামলা চালায়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত ১৪ই আগস্ট সকাল ৯টার দিকে রামদা, লাঠিসোঁটাসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলাকারীরা পানিশ্বরপাড়া গ্রামে প্রবেশ করে। তারা গ্রামের ৩৫ থেকে ৪০টি বাড়িঘর এবং দোকানপাটে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। স্থানীয় ডাইয়ারকান্দা বাজারে এই ঘটনার সাথে সম্পর্কহীন দোকানেও লুটপাট করা হয়।
দোকানদার মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, “ডাইয়ারকান্দা বাজারে আমার দোকানে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার মাল ছিল। হামলাকারীরা শাটার ভেঙে একটি দানাও রাখেনি, সব লুটপাট করে নিয়ে গেছে।” আরেক ভুক্তভোগী মো. সুমন জানান, তার দোকান থেকে ভেটেরিনারি ওষুধ এবং নগদ ৫০ হাজার টাকা লুট করা হয়েছে। ফুলবানু নামের এক নারী জানান, ভাত খাওয়ার সময় তার ঘর ভেঙে দুই বস্তা চাল এবং জমানো ৬০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে হামলাকারীরা।
হামলাকারীদের নিষ্ঠুরতা থেকে রক্ষা পায়নি বিয়ের অনুষ্ঠানও। গ্রামের সোহরাব আলীর বাড়িতে সেদিন বিয়ের আয়োজন চলছিল। দূরদূরান্ত থেকে আসা ৩০০-৪০০ আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ হামলাকারীরা এসে বিয়ের সমস্ত আয়োজন, ডেকোরেশন ও রান্নাবান্না নষ্ট করে দেয়। প্রাণভয়ে আত্মীয়-স্বজনরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
এমনকি অবলা প্রাণীদের ওপরও নির্মমতা চালানো হয়। বেশ কয়েকটি গরুর ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হামলাকারীরা। এছাড়া, ময়না মিয়া নামের এক বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির উপার্জনের একমাত্র সম্বল ভ্রাম্যমান রাইসমিলটিও সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় কোটি টাকার বেশি সম্পদ লুটপাট ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে গ্রামবাসীর দাবি।
এ হামলায় পানিশ্বরপাড়া গ্রামের অর্ধশতাধিকের বেশি নারী-পুরুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের কয়েকজন নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি এবং বাকিরা স্থানীয়ভাব চিকিৎসা নিয়েছে। হামলাকারীদের অব্যাহত হুমকির কারণে ভুক্তভোগীদের অনেকেই এখন হাসপাতালে আহত স্বজনদের দেখতে যেতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ভুক্তভোগী মো. হালিম, শাদির, মো. বাদল মিয়াসহ অনেকেই হামলাকারীদের নাম উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা জানান, আমগড়া ও নুল্লাপাড়ার কামাল পাশা, মওলা, টিটু, মুরসালিন, মোশাররফ, আবুল কালাম, শাহজাহান, সুজন ও আব্দুল হকের নেতৃত্বে হামলা পরিচালিত হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, এদের মধ্যে অনেকেই বহিষ্কৃত রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী।
শাদির নামের এক যুবক বলেন, “তারা আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। মহিলারাও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। আমরা নিজেদের বাড়িতেই এখন নিরাপদ বোধ করছি না।”
এ ঘটনায় অভিযুক্তদের অন্যতম আমগড়া গ্রামের কামাল পাশার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে তাদের পক্ষে থাকা রংছাতি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রুকন উদ্দিন পাঠান ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে বলেন, “নিউজ করার কী দরকার। নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির ঘটনাটি আমরা আলোচনা করে সমাধান করে নেব।”
পানিশ্বরপাড়া গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা অবিলম্বে এই হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় সংসদ সদস্য, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তারা দ্রুত হস্তক্ষেপ ও ন্যায়বিচারের জোর দাবি জানান, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নিরীহ গ্রামবাসীকে এমন ভয়াবহ পরিণতির শিকার হতে না হয়।


