নিজস্ব প্রতিবেদক: টানা অতিবৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত রবিবার (১৯ জুলাই) রাত থেকে শুরু হওয়া ঢলের তাণ্ডবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ধসে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি নদীভাঙনের ফলে আবাদি জমিতে বালু জমে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং ভেসে গেছে শতাধিক পুকুরের মাছ।
সোমবার (২০ জুলাই) সকালে সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে আসে।
পাহাড়ি ঢলের তোড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার নাজিরপুর ও লেংগুরা ইউনিয়নের যোগাযোগ অবকাঠামো। বিশেষ করে নলছাপ্রা বাজার-বালুচড়া উচ্চ বিদ্যালয় সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ঢলের পানির তীব্র প্রবাহে সড়কটির প্রায় একশো ফুট অংশ সম্পূর্ণ ধসে গিয়ে বড় ধরনের গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ওই সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কৃষক ও সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
ঢলের পানি ও নদীভাঙন কৃষকদের জন্য যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেংগুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়া ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে জানান, চেংনী নদীর পাড় ভেঙে ইউনিয়নের প্রায় পঞ্চাশ একর ফসলি জমিতে বালুর আস্তরণ জমেছে। এতে আবাদি জমিগুলো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, “নলছাপ্রা বাজার-বালুচড়া উচ্চ বিদ্যালয় সড়কসহ ইউনিয়নের একাধিক স্থানে রাস্তা ভেঙে গেছে। শুধু তাই নয়, ছোট-বড় শতাধিক পুকুরের মাছ ঢলের পানিতে ভেসে গেছে এবং কৃষকদের বোনা আমনের বীজতলাও বালু পড়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।”
একই ধরনের ক্ষতির কথা জানান খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবাইদুল হক। তার ইউনিয়নেও আমনের বীজতলা এবং শতাধিক মাছের পুকুর তলিয়ে গিয়ে মৎস্য চাষি ও কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
সড়ক ও কৃষির পাশাপাশি রেহাই পায়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। খারনৈ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওবাইদুল হক জানান, পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে গজারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বিদ্যালয়ে যাতায়াতের কাঁচা সড়কটিও ভেঙে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইউনিয়নের অন্যান্য কাঁচা ও পাকা সড়কেও পানির তোড়ে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলার প্রধান উব্দাখালী নদীর পানি বর্তমানে কলমাকান্দা সদর ডাকবাংলো পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার নিম্নাঞ্চলে নতুন করে প্লাবন ও ব্যাপক নদীভাঙনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড়ি ঢলের কারণে কলমাকান্দাবাসীকে এমন অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। তবে স্থানীয়দের মতে, এবারের ঢলের তীব্রতা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী জানান, প্রতি বছর এভাবে সড়ক ও ফসলের ক্ষতি হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভেঙে যাওয়া সড়কগুলোর সংস্কার, নদীভাঙন রোধে টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্য চাষিদের সরকারি সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে এই দুর্গত মানুষদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে।


