ফেরান তোরেনের অতিরিক্ত সময়ের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলেছে স্পেন। এর মাধ্যমে আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসির ফুটবলের বিশ্ব মঞ্চ থেকে বিদায়টা স্মরনীয় হলোনা।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে বার্সেলোনা স্ট্রাইকার তোরেস জয়সূচক গোলটি করেন।
একপেশে ফাইনালে আর্জেন্টিনা পুরো ১২০ মিনিট একটি শটও টার্গেটে করতে পারেনি।
মেটলাইফের ৮০ হাজারেরও বেশী সমর্থকের মধ্যে উপস্থিত থেকে পুরো ম্যাচ উপভোগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ব্রাজিলের পর বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের হাতছানি ছিল আর্জেন্টিনার সামনে। একইসাথে অধিনায়ক মেসির ক্যারিয়ারে এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ। কিন্তু স্পেন শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ায় ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকা কার্যত নিষ্প্রভ হয়ে পড়েন। প্রায় নিশ্চিতভাবেই ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন মেসি।
পুরো ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনা একের পর এক ফাউল কওে স্পেনের গতিরোধ করতে চেষ্টা করেছে। দক্ষিণ আমেরিকার দলটির সেই অসংযত খেলার পরিণতি ঘটে ইনজুরি টাইমে। স্পেনের ডিফেন্ডার পাও কুবারসির ওপর ভয়ংকর ট্যাকল করায় মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে মনে হচ্ছিল, কোনোভাবে ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যেতে পারবে আর্জেন্টিনা, কারণ স্পেন বারবার আক্রমণ করেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না।
অতিরিক্ত সময়ে নিকো উইলিয়ামসের একটি গোল বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বাতিল হওয়ার পর অবশেষে কাঙ্খিত গোলটি পেয়ে যায় স্পেন। পেদ্রো পোরোর উঁচু করে তোলা ক্রস বক্সের মধ্যে পৌঁছে যায় নিকো উইলিয়ামসের কাছে। তিনি হেডে বল নামিয়ে দেন ফেরান তোরেসের সামনে, আর তোরেস জোরালো শটে জালে বল পাঠিয়ে স্পেনকে এনে দেন ২০১০ সালের প্রথম শিরোপার পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি।
এর আগে ১৫তম মিনিটেই আর্জেন্টিনার হতাশার স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায়। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার বিপজ্জনক ট্যাকল করে ডানি ওলমোর গোড়ালিতে আঘাত করেন। তবে স্লোভেনিয়ার রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ শুধু ফাউল দিলেও ম্যাক অ্যালিস্টারকে হলুদ কার্ড দেখাননি।
কিছুক্ষণ পরই স্পেনও নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। আলেক্স বায়েনা কনুই দিয়ে লিওনেল মেসির পিঠে আঘাত করলেও সেই ঘটনাতেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি রেফারি।
এরপরও ছোট ছোট ফাউলের মাধ্যমে রেফারি ভিনচিচের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে থাকে আর্জেন্টিনা। লামিন ইয়ামালের পায়ের পেছনে অসাবধানী ট্যাকল করেও নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ভাগ্যক্রমে হলুদ কার্ড এড়িয়ে যান। অন্যদিকে স্পেন আক্রমণের পথ খুঁজতে থাকে। তবে ৩৯তম মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবালের নিচু শট সহজেই ধরে ফেলেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
ওয়ারজাবালের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফাউল করায় ৪১ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন। এর কিছুক্ষণ পরই চোটের কারণে মাঠ ছাড়েন লিসান্দ্রো। তাঁর পরিবর্তে নামেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওটামেন্ডি।
ফাইনালের বিতর্কিত দীর্ঘ বিরতিতে ম্যাডোনা, শাকিরা ও জাস্টিন বিবারের মতো তারকাদের নিয়ে আয়োজিত হাফটাইম শো ২৭ মিনিট ধরে চলে। তবে এতে স্পেনের ছন্দে কোনো প্রভাব পড়েনি।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ পুরোপুরি একপেশে হয়ে ওঠে। স্পেন একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে, আর আর্জেন্টিনা মরিয়া হয়ে শুধু রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত থাকে।
স্পেনের কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তে ফাবিয়ান রুইজ ও ওয়ারজাবালের জায়গায় নামান পেদ্রি ও ফেরান তোরেসকে। এরপরও আক্রমণের ধার অব্যাহত থাকে, আর আর্জেন্টিনা যেন পুরোপুরি অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়ে যায়।
ইয়ামাল দুর্দান্ত দক্ষতায় ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তোরেসের উদ্দেশে ক্রস তুলে দেন। তোরেসের হেড দারুণভাবে রুখে দেন মার্টিনেজ।
এরপর পেদ্রি ও কুবারসির দূরপাল্লার শট প্রথম চেষ্টায় ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি মার্টিনেজ। তবুও কোনোভাবে গোল হজম না করে টিকে থাকে আর্জেন্টিনা।
তবে বদলি হিসেবে নিকো উইলিয়ামস ও মিকেল মেরিনোর আগমনে স্পেনের আক্রমণে নতুন গতি আসে এবং গোলের জন্য চাপ আরও বাড়তে থাকে।
৮২তম মিনিটে প্রতিবাদ করায় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। এরপর তোরেস ও রদ্রি দুজনেই দূরপাল্লার শটে মার্টিনেজকে পরীক্ষা নেন।
ফার্নান্দেজ অতিরিক্ত সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের মাঠ ছাড়ায় আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হয়।
ইনজুরি টাইমের একেবারে শেষদিকে ইয়ামালের দুর্দান্ত বাঁকানো ফ্রি-কিক অসাধারণ দক্ষতায় এক হাতে ঠেকিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন মার্টিনেজ।
অতিরিক্ত সময়েও স্পেনের আধিপত্য অব্যাহত থাকে। নিকো উইলিয়ামসের হালকা ছোঁয়ায় নেওয়া হেড এক হাতে দারুণভাবে ফিরিয়ে দেন মার্টিনেজ।
এর কিছুক্ষণ পর উইলিয়ামস নিচু শটে বল জালে জড়ালেও মিকেল মেরিনোর সামান্য ফাউলের অভিযোগে রেফারি ভিনচিচ গোলটি বাতিল করেন।
তবে ১০৬তম মিনিটে আর স্পেনকে আটকানো যায়নি। ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে অবশেষে এগিয়ে যায় লা রোহা।
শেষ মুহূর্তে মরিয়া হয়ে সমতা ফেরানোর চেষ্টা চালায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু স্পেনের রক্ষণভাগ দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলে জয় নিশ্চিত করে এবং দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা নিজেদের করে নেয়।


