নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় গভীর রাতে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিচয় দিয়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ডাকাত দল বাড়ির সদস্যদের হাত-পা বেঁধে নগদ প্রায় তিন লাখ টাকা, পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান পোশাক লুট করে নিয়ে যায়। চাঞ্চল্যকর এই ডাকাতির ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ভুক্তভোগী পরিবারের আপন ভাতিজার নাম উঠে এসেছে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে ডাকাত দলের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।
টককৃতরা হলেন- হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার রাজ কুমার (২৬), জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার দিঘিরচর মুল্লাপাড়া গ্রামের আব্দুল হামিদ (৪৫) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার ছরনাল গ্রামের শাহীন আলম (৩৮)।
শনিবার (১৯ জুলাই) দিবাগত রাত ২টার দিকে উপজেলার কাকৈরগড়া ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান ওয়াদুদের বাড়িতে দুঃসাহসিক এই ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। রাত আনুমানিক ২টার দিকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে বাইরে বেরিয়ে আসেন গৃহকর্তা সিদ্দিকুর রহমান ওয়াদুদ। এ সময় ছয় সদস্যের একটি দল নিজেদের ডিবি পুলিশ হিসেবে পরিচয় দিয়ে জোরপূর্বক ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে।
ঘরে ঢুকেই তারা সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধে মাদক বিক্রি ও জাল টাকার ব্যবসার বানোয়াট অভিযোগ তুলে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করে। নানা কথাবার্তার একপর্যায়ে তারা পরিবারের সবার হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর তারা পুরো বাড়ি তছনছ করে নগদ প্রায় তিন লাখ টাকা, পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার, বেশ কয়েকটি মোবাইল ফোন এবং জামাকাপড়সহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।
ডাকাতির ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে ভুক্তভোগী সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে পাভেল মিয়া বলেন, “ঘরে ঢুকেই তারা নিজেদের ডিবি পুলিশের সদস্য বলে পরিচয় দেয়। এরপর আমাকে আর আমার বাবাকে একসঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখে। অন্যদিকে, আমার মা ও স্ত্রীকে অন্য একটি ঘরে আটকে রেখে চোখের সামনেই ঘরের সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়।”
এদিকে, এই ডাকাতির পেছনে যে নিজেদেরই রক্তের সম্পর্ক জড়িত, তা জেনে হতবাক পরিবারটি। ওয়াদুদের স্ত্রী নূর জাহান বেগম জানান, “আমি শুনেছি আমার দেবরের ছেলেই ছিল ডাকাতদের সাথে। সে সরাসরি ঘরের ভেতরে ঢোকেনি ঠিকই, ডাকাতি শেষে পালানোর সময় আশপাশের মানুষ তাকে দেখে ফেলেছে।”
ডাকাতরা চলে যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের আর্তচিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে এবং তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়েই দুর্গাপুর থানা পুলিশ কালক্ষেপণ না করে গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে অভিযানে নামে।
লুট হওয়া একটি মোবাইল ফোন সচল থাকায় প্রযুক্তির সহায়তা নেয় পুলিশ। সেটির সর্বশেষ লোকেশন ট্র্যাকিং করে পার্শ্ববর্তী কলমাকান্দা উপজেলার সিধলী এলাকা থেকে ডাকাত দলের তিন সদস্যকে আটক করা হয়। তবে দলের বাকি সদস্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তিনজনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে।
ওসি আরও জানান, আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ভুক্তভোগীদের আপন ভাতিজাই মূলত ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী। বিয়ে বাড়ির কথা বলে ডাকাতদের মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় কন্ট্রাক্টে আনা হয়েছিল। এ চক্রের মূল হোতা ওই ভাতিজাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে আটককৃত ব্যক্তিদের আদালতে সোপর্দ করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করলেও, আপন আত্মীয়ের এমন প্রতারণায় জনমনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশের টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


