চিপসের প্যাকেট ও ড্রেনের অভিশাপ: বন্যা কি শুধুই সরকারের দায়?

হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টিবিলাসের নেশায় আমরা সবাই কমবেশি আক্রান্ত। বৃষ্টি দেখলেই এক কাপ গরম চা আর জানালার গ্রিল ধরে ঝুম বৃষ্টি দেখার যে তৃপ্তি, তা অন্য কিছুর সাথে তুলনা হয় না। কিন্তু সেই বৃষ্টি যখন শহরের আকাশ থেকে নামে তখন তা আর নস্টালজিয়া থাকে না বরং হয়ে ওঠে এক দুঃসহ বিড়ম্বনা। অফিসে যাওয়ার পথে চাকরিজীবীরা যখন নোংরা পানিতে পা ডুবিয়ে চলেন, কিংবা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বৃষ্টির তোড়ে ভিজে বাসের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে তখন বৃষ্টি নিয়ে সেই পুরোনো আনন্দটুকু আর থাকে না।

রাস্তায় অকেজো হয়ে পড়ে থাকা গাড়ি, জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া ইঞ্জিন কিংবা নালা-নর্দমার সীমারেখা বুঝতে না পেরে মানুষের ড্রেনে পড়ে যাওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনার পর যখন সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে অভিযোগের বন্যা বইতে শুরু করে তখন রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো খুব সহজ। নগর পরিকল্পনার অভাব, ড্রেনেজ সিস্টেমের অকার্যকারিতা আর সরকারি উদাসীনতা এগুলো অবশ্যই আমাদের ভোগান্তির মূল কারণ। কিন্তু রাষ্ট্রের এই কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি আমাদের কি কোনো দায়িত্ব নেই? ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য যে ন্যূনতম সচেতনতা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন ছিল তা কি আমরা নিশ্চিত করেছি? নাকি দায়ভারটা কেবল সরকারের ঘাড়েই চাপিয়ে দিয়ে আমরা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব থেকে খালাস পেতে চাইছি?

আমাদের যেকোনো শহরের জলাবদ্ধতার দিকে তাকালে দেখা যায় সমস্যাটি কেবল ‘সিস্টেমের’ নয়, এটি আমাদের নিয়মিত অভ্যাসেরও অংশ। নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিবসহ বিশেষজ্ঞরা বারবারই সতর্ক করছেন যে আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থা আজ প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি শহরজুড়ে যে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল আর গৃহস্থালির বর্জ্য যে আমরা ড্রেনে বা রাস্তার পাশে অনায়েসে ফেলে আসছি সেগুলোই বৃষ্টির পানির প্রবাহ রুদ্ধ করছে? কর্তৃপক্ষের বিশাল বাজেট ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ সত্ত্বেও আমাদের এই অপরিবর্তিত অভ্যাসের কারণে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

আমরা কি কখনো সচেতন হয়েছি ড্রেনে বর্জ্য না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার দায়িত্বটুকু আমাদেরই? নাকি আমরা মনে করি ড্রেন পরিষ্কার রাখা শুধুই কর্তৃপক্ষের কাজ আর ড্রেন ভরাট করে ফেলা আমাদের অধিকার? শহরের এই জমে থাকা পানিতে যখন মশা বংশবিস্তার করে তখন আমরা বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করি। কিন্তু নিজেদের আঙিনা পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে আমাদের অনীহা কি আমাদের সেই সমালোচনার নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না? আসলে উন্নয়নের দোহাই দিয়ে নিজের দায় এড়ানোই এখন আমাদের নাগরিক সংস্কৃতির এক বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শহরের এই ‘ম্যান-মেড’ জলাবদ্ধতার পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদে বন্যার রূপটি খানিকটা ভিন্ন। শহরের মতো এখানে হয়তো পলিথিন বা চিপসের প্যাকেট প্রধান কারণ নয় কিন্তু এখানেও আমরা এক অদৃশ্য সংকটে আছি। গ্রামীণ অনেক এলাকায় জমি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হওয়ায় কর্তৃপক্ষের পক্ষে চাইলেই সব জায়গায় ইন্টারফিয়ার করা সম্ভব হয় না। এই সুযোগে আমরা অনেক সময় ব্যক্তিগত স্বার্থে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বা খালের মুখ রুদ্ধ করে মাছ চাষে বা বসতবাড়ি নির্মাণ করি। নিজের এক টুকরা জমির সীমানা বাড়াতে গিয়ে আমরা যে পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশিন ব্যবস্থা আটকে দিচ্ছি, সেই দায়ভার কি আমরা নিচ্ছি?

এর চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের অপরিকল্পিত উন্নয়ন। রাস্তাঘাট নির্মাণ বা অবকাঠামো উন্নয়নের নামে আমরা যেভাবে জলাধার ভরাট করছি বা পানির স্বাভাবিক পথগুলো বন্ধ করছি তা বন্যার সময় ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় স্থানীয়ভাবে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নেওয়ার সময় পরিবেশগত প্রভাবের চেয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধাটাই প্রাধান্য পায়। প্রশ্ন হলো বন্যার সময় যখন ঘরবাড়ি তলিয়ে যায় তখন আমরা সরকারকে দায়ী করে যে ক্ষোভ প্রকাশ করি, উন্নয়নের নামে আমাদের নিজস্ব সেই অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডগুলো কি সেই বন্যার ভয়াবহতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে না?
সরকারের ওপর দোষ চাপানো সহজ কিন্তু গ্রামীণ পর্যায়ে যখন আমরা নিজেরা জলাধার ভরাট করি বা প্রকৃতির পথ রুদ্ধ করি তখন আসলে আমরা নিজেরাই বন্যার পথ প্রশস্ত করছি। তাই বন্যা কেবল কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারি অব্যবস্থাপনার ফল নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত অদূরদর্শিতার এক করুণ পরিণতি।

আমরা ফেসবুকের ওয়ালে উন্নত বিশ্বের শহরগুলোর ছবি দেখে মুগ্ধ হই। জাপান বা নেদারল্যান্ডসের ঝকঝকে রাস্তা তাদের পানির নিচে সুড়ঙ্গপথ আর বন্যার পানি ব্যবস্থাপনার অভাবনীয় প্রযুক্তি দেখলে আমাদের অনেকেরই দীর্ঘশ্বাস পড়ে, আর বলি ‘ইশ, আমাদের দেশটা যদি এমন হতো!’ আমরা নিয়মিত তাদের ড্রেনেজ সিস্টেমের প্রশংসা করি। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিয়ে বলি, ‘দেখো, এরা কীভাবে শহর বাঁচায়।’ কিন্তু এই ‘অনুরাগী’ নাগরিকরাই যখন নিজেদের গলি বা ড্রেন দিয়ে হাঁটেন, তখন চিপসের প্যাকেটটি ড্রেনে ফেলতে এক মুহূর্তও ইতস্তত করেন না।

বিশ্বের উন্নত শহরগুলো বন্যার পানি আটকানোর জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যায় বিনিয়োগ করে ঠিকই কিন্তু তাদের সাফল্যের আসল চাবিকাঠি তো প্রযুক্তি নয় বরং নাগরিকদের সচেতনতা। নেদারল্যান্ডসের মানুষ জানে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে না দিলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। আর জাপানিরা তাদের ড্রেনেজ সিস্টেমকে এমনভাবে রক্ষা করে যেন সেটা তাদের বাড়ির ড্রয়িংরুম। অথচ আমরা একদিকে উন্নত বিশ্বের উন্নয়নের গল্প শুনি আর অন্যদিকে ড্রেনের মুখ বন্ধ করে নিজের হাতেই শহরের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াই। আমরা যেন এক অদ্ভুত দ্বিমুখী চরিত্র নিয়ে বেঁচে আছি। অন্যের ঘরে শৃঙ্খলা দেখলে হাততালি দিই কিন্তু নিজের ঘরে নিয়ম মানার সময় সেটাকে অবান্তর বলে মনে করি।

বৃষ্টি প্রকৃতির এক অপার দান, যাকে আমরা ছোটবেলার নস্টালজিয়ায় ‘বৃষ্টিবিলাস’ বলে চিনি। কিন্তু নাগরিক জীবনের এই জলাবদ্ধতা বা বন্যার সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে আমরা কতটুকু অবজ্ঞা করেছি। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত দুর্বলতা বা অপরিকল্পিত নগরায়ন অবশ্যই আমাদের দুর্ভোগের বড় কারণ তবে সেই দুর্ভোগকে দীর্ঘস্থায়ী করার পেছনে আমাদের নিজস্ব নাগরিক অভ্যাসগুলোর দায়ও কোনো অংশে কম নয়। অন্যের ঘরের ঝকঝকে শৃঙ্খলা দেখে প্রশংসা করা সহজ কিন্তু নিজের বাড়ির আঙিনা বা শহরের ড্রেনটিকে পরিষ্কার রাখাটা অনেক বেশি কঠিন।

বন্যা কেবল সরকারি ব্যর্থতার নাম নয় এটি আমাদের সম্মিলিত অদূরদর্শিতার এক করুণ পরিণতি। যেদিন আমরা নিজেদের দায়টুকু স্বীকার করে ড্রেনে ময়লা ফেলা বন্ধ করব সেদিন হয়তো বৃষ্টি আর আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে আসবে না। সেদিন ঝুম বৃষ্টি মানেই থাকবে কেবল এক কাপ গরম চা, প্রিয় বই আর জানালার পাশে বসে দেখা সেই পুরোনো ‘বৃষ্টিবিলাস’।

 

আবিদ চৌধুরী
শিক্ষার্থী, পিস এন্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version