নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধনু নদ থেকে আবারও বেপরোয়াভাবে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি সংঘবদ্ধ চক্র নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে দিন-রাত ড্রেজার দিয়ে বালু লুট করছে। এতে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি নদীভাঙন ও মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ওই এলাকায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পাঁচহাট ও আন্দাইর গ্রামের বিপরীত পাশে ধনু নদীর তীরবর্তী ‘বাগানীর চর’ এলাকা থেকে গত কয়েকদিন ধরে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। শুধু দিনের আলোতেই নয়, নুরালীপুর ও পাতরা গ্রাম সংলগ্ন এলাকাগুলোতে রাতের আঁধারেও চলছে এই অবৈধ মহোৎসব।
উত্তোলিত এসব বালু নৌপথে বড় ট্রলার ও কার্গোর মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী জেলার বিভিন্ন এলাকায় চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলা, কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলা এবং চামটা এলাকার বিভিন্ন স্থানে এসব বালুর বড় চালান সরবরাহ করা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন পার করছেন তীরবর্তী মানুষ। এ বিষয়ে পাঁচহাট গ্রামের বাসিন্দা আপনুজ্জামান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারও একটি সিন্ডিকেট ধনু নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু করেছে। তিনি দ্রুত প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বালু বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাদের দাবি, প্রশাসনের নজরদারি ও টহলের অভাবেই অবৈধ কর্মকাণ্ড দিনের পর দিন অব্যাহত রয়েছে। গত বছর একই এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগে উপজেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে কয়েকজনকে আটক ও জরিমানা করেছিল। সে সময় কার্যক্রম বন্ধ হলেও সম্প্রতি চক্রটি ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে অভিযোগের আঙুল উঠেছে স্থানীয় যুবদল নেতাদের দিকে। জানতে চাইলে ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি পারভেজ বলেন, “আমরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই নদী থেকে বালু উত্তোলন করছি। উপজেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও থানা পুলিশ বিষয়টি জানে।” তবে কী ধরনের অনুমতি রয়েছে বা কোনো কাগজপত্র আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বৈধ অনুমতিপত্র দেখাতে পারেননি। পরে কাগজ দেখানোর আশ্বাস দিলেও তা আর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক এনামুল ছোটন দাবি করেন, তাদের দলের কিছু লোক বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ঠিকই, তবে পূর্ববর্তী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছ থেকে তারা লিখিত অনুমতি নিয়েছেন বলে তিনি জেনেছেন। যদিও এই দাবির স্বপক্ষেও কোনো নথিপত্র দেখাতে পারেননি তিনি।
বালু উত্তোলনের বিষয়ে প্রশাসন তৎপরতা শুরু করেছে। লেপসিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জগতজ্যোতি চৌধুরী বলেন, “পাঁচহাট এলাকার আন্দাইর ও বাগানী এলাকায় বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে ধনু নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. অলিদুজ্জামান এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি বলেন, “পাঁচহাট এলাকায় ধনু নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে আমি তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যাই এবং সংশ্লিষ্টদের বালু উত্তোলন বন্ধ করতে নির্দেশ দিই।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন, বালু উত্তোলনকারীরা লিখিত অনুমতির দাবি করলেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে একটি লিখিত অনুমতির কপি পাওয়া গেছে, যা গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বালু উত্তোলন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুসফিকুর রহমান বলেন, “খালিয়াজুরীর পাঁচহাট এলাকার আন্দাইর ও বাগানী এলাকায় ধনু নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত বা মৌখিক অনুমতি কিংবা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।” তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন।


