নিজস্ব প্রতিবেদক: অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ এবং নিষিদ্ধ উপকরণের অবাধ ব্যবহারে দেশজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে কমছে ফসলের উপকারী কীটপতঙ্গ ও জলজ প্রাণবৈচিত্র্য। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে শস্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পুরো কৃষি ব্যবস্থা এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে। পরিবেশগত এই বিপর্যয় রোধে ও জনসচেতনতা বাড়াতে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ সংলাপ ও প্রকৃতিবন্ধন।
রবিবার (১৬ জুন) বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক’ এবং ‘আটপাড়া গ্রিন কোয়ালিশন কমিটি’র যৌথ উদ্যোগে আটপাড়া উপজেলা অফিসার্স ক্লাবে “জলাভূমিতে কীটনাশক ও নিষিদ্ধ উপকরণের ব্যবহার: জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের বিলুপ্তি” শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করা হয়।
আটপাড়া গ্রিন কোয়ালিশন কমিটির সভাপতি সাজেদুর রহমান সেলিমের সভাপতিত্বে সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনাব শাহনূর আলম।
অনুষ্ঠানে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মাহফুজা খান, মৎস্য কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান এবং যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ওমর ফারুকসহ উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সাংবাদিক, কৃষক, জেলে, যুবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশ নেন।
সংলাপের শুরুতে কীটনাশক ও নিষিদ্ধ উপকরণের ব্যবহার এবং জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের বর্তমান অবস্থার ওপর শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বারসিক এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান। এরপর মূল প্রবন্ধ (কীনোট) উপস্থাপন করেন যুব সংগঠক তাজিম রহমান রাকিব।
মূল প্রবন্ধে তাজিম রহমান রাকিব বলেন, “জলাভূমি আছে বলেই প্রাণের বৈচিত্র্য আছে, বাস্তুতন্ত্র টিকে আছে। পুষ্প, পাখি, মিঠাপানির মাছ, হিজল-করচ, মান্দার, তমাল, বরুম গাছ, পানির স্তর- সবকিছুই জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল। নদী ও জলাভূমি না থাকলে সবুজ উধাও হয়ে যাবে। জলাভূমি যেখানে আছে সেখানে বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকবে, বন্যপ্রাণী ও জলজ উদ্ভিদ বাঁচবে। এটাই বাংলাদেশের মূল বাস্তুতন্ত্র।”
কৃষিতে অতিরিক্ত বালাইনাশকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মাহফুজা খানম বলেন, “ফসলের মাঠে বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে শুধু ক্ষতিকর কীটপতঙ্গই মারা যায় না, উপকারী পোকামাকড়ের ডিমও ধ্বংস হয়। অতিরিক্ত কীটনাশকের কারণে পরাগায়নে সবচেয়ে জরুরি উপকারী পতঙ্গগুলো মারা পড়ছে। অথচ ফসল উৎপাদনে পরাগায়নের কোনো বিকল্প নেই। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার পুরো প্রাণিকুল ও জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।”
সাংবাদিক সৈয়দ মাকসুদুল হক জলাভূমিতে অবৈধ জালের ধ্বংসাত্মক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি জাল’ ছোট মাছ, মাছের ডিম, পোনামাছ, শামুক, ঝিনুক, চিংড়ি, কাঁকড়া থেকে শুরু করে জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণের খাদ্যের উৎস পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এতে জলজ প্রাণীদের প্রজননচক্র ভেঙে পড়ছে। এছাড়াও জলাভূমিতে কারেন্ট জাল, বেড়জাল, এয়ারগান এবং বিষটোপ হিসেবে অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড, গ্যাস ট্যাবলেট, রোটেনন, ল্যাম্বডা সাইহ্যালোথ্রিন ও গ্লাইফোসেটের মতো মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে।”
সংলাপের উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় কীটনাশকের ব্যবসা ও ব্যবহারে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কৃষকদের বিষমুক্ত বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবন ও ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি জমিতে পরিমিত সার প্রয়োগ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জনে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
আলোচনা পর্ব শেষে উপজেলা চত্বরে জলজ প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা ও এর বিলুপ্তি রোধে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা হাতে হাত রেখে ‘প্রকৃতিবন্ধন’-এর মাধ্যমে জলাভূমিতে কীটনাশক ও নিষিদ্ধ উপকরণ ব্যবহারের তীব্র প্রতিবাদ জানান।


