প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজ ব্যবহার ও অনলাইনভিত্তিক বাণিজ্যের প্রসারে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ময়মনসিংহেও দ্রুত বাড়ছে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা। ঘরের দায়িত্ব সামলে অনেক নারী এখন অবসর সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পোশাক, হস্তশিল্প, খাবার, প্রসাধনী ও দেশীয় পণ্যের ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তাদেরই একজন জেলার গফরগাঁও উপজেলার জুলেখা খাতুন সোমা, যিনি নিজে তো সাফল্য অর্জন করেছেনই, এখন অনেক নারীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম।
সম্প্রতি ময়মনসিংহ শহরে এক ঘরোয়া আড্ডায় নিজের উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান, মাত্র ৩৩ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে চার বছর আগে নিজের বাসা থেকে ‘এনএসপি হাউস’ নামে অনলাইন ও অফলাইন সমন্বিত ব্যবসা শুরু করেন।
শুরুতে সীমিত পরিসরে থ্রি-পিস, শাড়ি ও প্রসাধনী সামগ্রী বিক্রি করলেও বর্তমানে তার ব্যবসা দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশেও পণ্য পাঠাচ্ছেন জুলেখা খাতুন সোমা।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি মাসে তার প্রতিষ্ঠানে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়। ব্যবসায় এখন প্রায় ১৬ থেকে ১৭ লাখ টাকার পুঁজি ও পণ্য রয়েছে।
জুলেখা খাতুন সোমা উদ্যোক্তা পরিচয়ের পাশাপাশি গফরগাঁওয়ের আলতাফ গোলন্দাজ ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবেও কর্মরত আছেন। সংসার, চাকরি ও ব্যবসা- সবকিছু একসঙ্গে সামলে তিনি সফলতার উদাহরণ তৈরি করেছেন।
আলাপচারিতায় জুলেখা খাতুন সোমা বলেন, ‘শুরুতে অনেকেই বলতেন, মেয়েদের পক্ষে ব্যবসা করা কঠিন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করেছি, ইচ্ছাশক্তি ও পরিকল্পনা থাকলে নারীরাও সফল হতে পারে। এখন আমার ব্যবসা দেখে অনেক নারী অনুপ্রাণিত হচ্ছেন, এটিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
তিনি জানান, বর্তমানে অনলাইন ব্যবসায় গ্রাহকদের আস্থা অর্জনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভালো মানের পণ্য ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করেই তিনি গ্রাহকদের আস্থা ধরে রেখেছেন।
জানা যায়, জুলেখার মতো ময়মনসিংহে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ফেসবুকভিত্তিক অনলাইন ব্যবসা নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়েও নারীরা ঘরে বসেই উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন। এর উজ্জ্বল উদাহরণ জুলেখা খাতুন সোমা নিজেই।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ময়মনসিংহ কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় নিবন্ধিত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা, ফুড প্রসেসিং, বুটিক, হস্তশিল্প ও কসমেটিকস খাতে নারীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। সরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধির ফলে নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের আরেক নারী উদ্যোক্তা নুসরাত জাহান বলেন, আগে নারীরা চাকরির জন্য অপেক্ষা করতেন। এখন অনেকেই নিজে কিছু করার চিন্তা করছেন। ফেসবুক ও অনলাইন মার্কেটপ্লেস আমাদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।
আলতাফ গোলন্দাজ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মাকসুরাতুল ফেরদৌসী রুমকি বলেন, সোমা ম্যাডাম আমাদের মতো তরুণীদের জন্য অনুপ্রেরণা। তার উৎসাহে আমি নিজেও অনলাইনে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেছি। এখন নিজের পড়াশোনার খরচের একটা অংশ নিজেই বহন করছি।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জুলেখা খাতুন সোমা জানান, নারী উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ এখনও পুঁজি সংকট, প্রযুক্তিগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতা ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। তবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সফল উদ্যোক্তাদের গল্প নতুনদের সাহস জোগাচ্ছে।
স্থানীয় সাংবাদিক শফিউল কাদির বলেন, জুলেখা খাতুন সোমা শুধু নিজে স্বাবলম্বী হননি, অন্য নারীদেরও উৎসাহিত করছেন। তাঁর মতো নারীরা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছেন। নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে স্থানীয় পর্যায়ে আরও সহায়তা প্রয়োজন।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারাও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখছেন। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপপরিচালক নাজনীন সুলতানা এই প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমানে নারীরা শুধু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নন, তাঁরা কর্মসংস্থানও তৈরি করছেন। সরকার নারীদের প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ নারীদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা তাঁদের জন্য সময় ও স্থানগত সীমাবদ্ধতা কমিয়ে দিয়েছে।
এদিকে জুলেখা খাতুন সোমা ইতোমধ্যে ‘স্মার্ট নারী উদ্যোক্তা আইসিটি গ্র্যান্ট’ সম্মাননা পেয়েছেন। এছাড়া উদ্যোক্তাদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘নিজের বলার মতো গল্প’ থেকে ময়মনসিংহ জেলার শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যবসায়িক সংগঠন থেকেও পেয়েছেন সম্মাননা।
জুলেখা বলেন, ‘স্মার্ট নারী উদ্যোক্তার তালিকায় নিজের নাম দেখে আমি গর্বিত। এই স্বীকৃতি আমাকে আরও দায়িত্বশীল করেছে। ভবিষ্যতে আরও নারীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চাই।’
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে নিতে সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ, ই-কমার্স ব্যবস্থাপনা শিক্ষা ও নিরাপদ অনলাইন লেনদেন নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহায়তা বাড়ানো গেলে ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী উদ্যোক্তাদের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সংসার ও সামাজিক বাধা পেরিয়ে জুলেখা খাতুন সোমাদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প এখন অনেক নারীর আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতিতে নারীদের এই অংশগ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত সফলতার গল্প নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


