শেখ শামীম: নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মহোৎসব চলার কথা থাকলেও কৃষকের চোখে এখন কেবলই অশ্রু। প্রকৃতি আর অব্যবস্থাপনার দ্বিমুখী লড়াইয়ে পিষ্ট হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক। ধান কাটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হওয়ার পরও মাঠ পর্যায়ে সরকারি ভর্তুকির কম্বাইন হারভেস্টার না পাওয়ায় পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত একর জমির ফসল।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় কৃষকদের সেবা দেওয়ার শর্তে বরাদ্দ পাওয়া যন্ত্রগুলো প্রভাবশালী মালিকরা অধিক লাভের আশায় অন্য জেলা ও উপজেলায় ভাড়ায় খাটুচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে এখন পর্যন্ত কলমাকান্দায় ৬২টি হারভেস্টার এবং একটি ভুট্টা হারভেস্টার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে, এসব যন্ত্রগুলো স্থানীয় কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা দেবে। বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। তালিকাভুক্ত অনেক মালিক তাদের যন্ত্র দুই-তিন বছর ধরে জেলার বাইরে পরিচালনা করছেন। এমনকি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া যন্ত্রও জেলার কেন্দুয়া উপজেলায় ভাড়ায় চলছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কেন্দুয়ায় জনৈক রবিন মিয়া নামে এক পরিচালক জানান, গত দুই বছর ধরে কলমাকান্দার একটি হারভেস্টার তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কলমাকান্দা থেকে কেউ এটি ফেরত নেওয়ার জন্য তার সাথে যোগাযোগও করেনি।
সরেজমিনে কলমাকান্দার খারনৈ, বড়খাপন ও নাজিরপুর ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে কৃষকের করুণ দৃশ্য। চারদিকে থৈ থৈ পানিতে তলিয়ে গেছে পাকা ও আধাপাকা ধান।
বড়দল গ্রামের কৃষক আবদুল্লাহ তার ১২ বছরের শিশু সন্তান বায়েজিদকে নিয়ে কোমর সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন। তিনি বলেন, “দেড় একর জমি লাগাইছি, সব পানির তলে। হারভেস্টার পাই না, কামলাও নাই। বাধ্য হয়ে পোলারে লগে নিয়া নামছি “
একই হাহাকার নাজিরপুর ইউনিয়নের কয়রা গ্রামের রফিকুলের কণ্ঠেও। তিনি জানান, সময়মতো যন্ত্র পেলে অন্তত আধা-পাকা ধানটুকু ঘরে তোলা যেত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত কৃষকের বদলে প্রভাবশালীরা ভর্তুকির হারভেস্টারগুলো কবজা করেছেন। কৃষি বিভাগের দুর্বল তদারকিকে এই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। কৃষকরা জানেনই না কোথায় হারভেস্টার পাওয়া যায় বা কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়া সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায়, জ্বালানি তেলের সংকট এবং দক্ষ অপারেটর না থাকাকে সংকটের নেপথ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, কিছু হারভেস্টার অন্য এলাকায় গেছে। তবে সেগুলো দ্রুত ফিরিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। যদিও তার দাবির সাথে মাঠের বাস্তবতার এবং হারভেস্টার চালকদের বক্তব্যের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম. মিকাইল ইসলাম এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেন, “সরকারি ভর্তুকির যন্ত্র মূলত স্থানীয় কৃষকদের জন্য। এগুলো মৌসুমে বাইরে থাকার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি এবং কৃষি কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
সরকার কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে যেসব যন্ত্র কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য দিয়েছে, তা যখন অসাধু মালিকদের পকেট ভারী করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই বরাদ্দের সুফল নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন সময়ের দাবি। কৃষকদের আকুতি- কেবল কাগজ-কলমে নয়, বাস্তবে যেন সরকারি ভর্তুকির কৃষি যন্ত্রগুলো তাদের গোলায় ধান তুলে দিতে সহায়তা করে।



