শেখ শামীম, কলমাকান্দা: নেত্রকোনার কলমাকান্দা সীমান্তে জব্দকৃত ভারতীয় চোরাই প্রসাধনী পণ্য ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে পুলিশের এক উপ-পরিদর্শকের (এসআই) ঘুষের দর-কষাকষির অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে। এ ঘটনায় জেলা পুলিশ বিভাগ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে অভিযুক্ত এসআই আবু হানিফাকে ক্লোজড এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিদ্দিক হোসেনকে বদলি করেছে। ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) কলমাকান্দার থানার ওসি মো. সিদ্দিক হোসেনকে বদলি এবং গতকাল (বুধবার) রাতেই এসআই আবু হানিফাকে ক্লোজড করা হয়।
এরআগে গতকাল বিকেল থেকে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়া দুটি অডিও ক্লিপে শোনা যায়, এসআই আবু হানিফা ও চোরাচালান চক্রের মূলহোতা হিসেবে পরিচিত জসিম উদ্দিনের মধ্যে দেন দরবার চলছে।
গত মঙ্গলবার (৫ মে) গভীর রাতে কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রাঙ্গামাটিয়া এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে একটি পিকআপ ভর্তি ১৮ বস্তা ভারতীয় প্রসাধনী সামগ্রী (ডাভ শ্যাম্পু, অলিভ অয়েল ইত্যাদি) জব্দ করা হয়। এ সময় চালক নাসিম ও সহকারী মনির হোসেনকে আটক করা হলেও মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত জসিম উদ্দিনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়।
ভাইরাল অডিওর একটি অংশে জসিমকে বলতে শোনা যায়, “স্যার, আপনাকে ৮০ হাজার টাকা দেব। আমাকে মামলায় দেবেন না, শুধু দুই বস্তা মাল আটক দেখাবেন।” জবাবে অন্য প্রান্ত থেকে বলা হয়, “না ভাই, এর কম হবে না, তিন লাখ টাকা দেন।”
পরবর্তী আরেকটি অডিওতে কণ্ঠটি আরও কঠোর হয়ে বলে, “আপনি যা করার দ্রুত করেন। আড়াই লাখ টাকা নিয়ে আসেন।” এমনকি আলাপচারিতার সময় হোয়াটসঅ্যাপ কল রেকর্ড না করার বিষয়েও সতর্ক করতে শোনা যায় ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই আবু হানিফা প্রথমে একে ‘কৌশলগত অভিযান’ বলে দাবি করলেও অডিও ফাঁসের পর ফোনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
অন্যদিকে, কলমাকান্দা থানার ওসি মো. সিদ্দিক হোসেন নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে বলেন, “কথোপকথনকারী ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে এসআই হানিফা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওই চোরাকারবারির সাথে আমার কোনো যোগাযোগ হয়নি।”
অডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নেত্রকোনার সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) স্বজল কুমার সরকার জানান, এসআই আবু হানিফাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে। পাশাপাশি ওসি মো. সিদ্দিক হোসেনকে কেন্দুয়া পেমই পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মামলার আসামি জসিম উদ্দিন এলাকায় ‘স্মাগলার জসিম’ নামে পরিচিত এবং দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, পুলিশ ও চোরাকারবারিদের এমন ‘মধুর সম্পর্ক’ দীর্ঘদিনের, যা অডিও ফাঁসের মাধ্যমে এবার প্রকাশ্যে এলো।
বর্তমানে এলাকায় এ নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য বিরাজ করছে। পুলিশি তদন্তে পর্দার আড়ালের আরও কোনো তথ্য বেরিয়ে আসে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে কলমাকান্দাবাসী।

