নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার মদন উপজেলায় কওমি মহিলা মাদরাসায় ১১ বছর বয়সি এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ওই মাদ্রাসার মুহতামিম (প্রধান শিক্ষক) আমান উল্লাহ সাগরের লাগাতার পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শিশুটি বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে মদন থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্ত মাদরাসার মুহতামিম আমান উল্লাহ সাগর বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের বড়বাড়ি ভাগবৎপুর এলাকায় অবস্থিত ‘হযরত ফাতেমা তুযযাহরা (রাঃ) কওমি মহিলা মাদরাসা’য়।
মঙ্গলবার (৫ মে) ভুক্তভোগীর বাড়িতে গেলে শিশুটি জানায়, মাদ্রাসা যখন ছুটি হয়ে যেত বা ফাঁকা থাকত, তখন মুহতামিম সাগর হুজুর তাকে নিজের কক্ষ ও মাদরাসা ঝাড়ু দেওয়ার নির্দেশ দিতেন।
“রুম ঝাড়ু দিতে গেলে হুজুর দরজা লাগিয়ে দিত এবং আমার মুখের ওপর চেপে ধরত”- জানায় ভুক্তভোগী শিশু। এভাবেই ভয় দেখিয়ে তিন-চার দিন তাকে ধর্ষণ করা হয়। নির্যাতনের পর শিশুটির হাতে কখনো ৫০ টাকা, কখনো ১০০ টাকা ধরিয়ে দিতেন অভিযুক্ত শিক্ষক। ঘটনা কাউকে জানালে ভয় দেখিয়ে শিশুটির মুখ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
নেত্রকোনা মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড সম্পাদক ফারহানা সুলতানা এবং প্রশিক্ষণ সম্পাদক ফাহমিনা সুলতানা জানান, অভিযুক্তের স্ত্রী সেসময় সন্তানসম্ভবা ছিলেন। আর সেই সুযোগেই ১১ বছরের অবুঝ শিশুটিকে নিজের লালসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার বানায় ওই শিক্ষক। এরআগে, একবার ওই শিশুটির গালে কামড় দেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল সাগরের বিরুদ্ধে। তখন শিশুটির পরিবার মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ করে দিলে, অভিযুক্তের পরিবার বাড়িতে গিয়ে পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে পুনরায় শিশুটিকে মাদ্রাসায় নিয়ে যায়। আর এরপরই ঘটে শিশুটির চূড়ান্ত সর্বনাশ।
পরিবারের ভয়ে শিশুটি মুখ খুলতে না পারলেও শারীরিক পরিবর্তনের কারণে বিষয়টি মায়ের নজরে আসে। ভুক্তভোগীর মা জানান, “মেয়ে আমাকে কিছু জানায়নি। রাতে ঘুমানোর সময় ওর গায়ে হাত পড়লে আমি বুঝতে পারি কিছু একটা সমস্যা হয়েছে।” পরে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পর জানা যায়, শিশুটি সাড়ে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এরপর চাপ দিলে তার মেয়ে সাগর হুজুরের নাম প্রকাশ করে।
শিশুটির নানা জানান, প্রায় এক মাস আগে শিশুটির চোখ-মুখ ফোলা দেখে এবং তার পেটে ব্যথার কথা শুনে তারা সন্দেহ করেন। চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে গর্ভাবস্থার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
ঘটনা জানাজানির পর অভিযুক্ত মুহতামিম আমান উল্লাহ সাগর গা ঢাকা দেন। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, মেয়েটি এক বছর আগে তার মাদ্রাসা ছেড়ে ঢাকায় চলে গিয়েছিল এবং পরে সিলেটে থেকেছে। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে দাবি করে তিনি সুষ্ঠু তদন্ত ও ডিএনএ টেস্টের দাবি জানান এবং এ ঘটনার জন্য ভুক্তভোগীর নানা বা অন্য কেউ জড়িত থাকতে পারে উল্লেখ করেন অভিযুক্ত শিক্ষক।
ডিএনএ টেস্টের দাবির বিষয়ে শিশুটির নানা বলেন, “সে (অভিযুক্ত) ডিএনএ টেস্ট করাতে চাইলে করুক। যদি আমি বা আমার পরিবারের কেউ দোষী হয়, তবে আমাদেরও শাস্তি হোক। আর সে দোষী হলে তারও শাস্তি হতে হবে। আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই।”
সংশ্লিষ্ট কাইটাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আবু তাহের আজাদ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “সাংবাদিকদের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। আগে জানলে শুরুতেই আইনি ব্যবস্থা নিতাম। অমানবিক এমন ঘটনার কঠোর বিচার হওয়া প্রয়োজন।”
এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মদন উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মুফতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আপসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে আইনি লড়াই করতে চান। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে আরও বলেন, দোষী প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। তবে ডিএনএ টেস্ট বা আদালতের রায়ের আগে তাকে (অভিযুক্ত) যেন অযথাই অপবাদ দেওয়া না হয়; সে পর্যন্ত সচেতন মহলকে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানান তিনি।
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। তিনি বলেন, “মামলা রুজু হওয়ার পরপরই আসামি গ্রেপ্তারের জন্য আমরা বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করছি। আসামির মোবাইল নম্বর বন্ধ রয়েছে, তবে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। খুব শিগগিরই আমরা তাকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হবো।”
এদিকে, মদন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী নেত্রকোনা-৪ আসনের সংসদ সংসদের নির্দেশনায় ভুক্তভোগীর বাড়ি পরিদর্শন করে পরিবারটিকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, “জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে আছে। শিশুটির শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে আমরা শুকনা খাবার ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। সমাজকল্যাণ পরিষদ থেকে অনুদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ বহন করা হবে।”
ডিএনএ টেস্টের বিষয়ে ইউএনও জানান, যেহেতু বাচ্চা এখনো জন্ম নেয়নি, তাই ডেলিভারির পর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অপরাধীকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।



