শেখ শামীম, কলমাকান্দা: “শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। আপনাদের হাতেই তৈরি হন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ডিসি কিংবা ইউএনও। কিন্তু গত ১০-২০ বছরে দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষক সমাজ সরাসরি দলীয় রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, শিক্ষকতা পেশায় থেকে কোনো দলীয় রাজনীতি করা যাবে না। কারো যদি রাজনীতি করার ইচ্ছা থাকে, তবে শিক্ষকতা পেশা থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতিতে আসুন।”
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের উপ-স্পিকার (ডেপুটি স্পিকার) ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এসব কথা বলেন।
কলমাকান্দা উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের সাথে আয়োজিত এ মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, কলমাকান্দা শাখার আহ্বায়ক মো. এমদাদুল হক। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শিক্ষক রাজা হান্নান তালুকদার।
উপ-স্পিকার দীর্ঘ বক্তব্যে শিক্ষকদের রাজনীতিকরণের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমি অনেক শিক্ষককে দেখেছি রাজনৈতিক নেতাদের সমাবেশে গিয়ে বক্তব্য রাখতে, জিন্দাবাদ স্লোগান দিতে। দয়া করে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসুন। আমি যতদিন আপনাদের পাশে থেকে দায়িত্ব পালন করব, কাউকে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে দেব না। শিক্ষকদের কাজ নেতাদের পেছনে দুপুর বেলা রোদে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেওয়া নয়, তাদের কাজ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করা।”
তিনি আরও বলেন, “আমার কথাগুলো হয়তো আপনাদের কাছে একটু রূঢ় মনে হতে পারে, কিন্তু একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা আমার দায়িত্ব।”
শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমরা যখন পড়েছি, তখন টিনের চালে বৃষ্টি পড়লে পলিথিন পেঁচিয়ে বই নিয়ে আসতাম। কিন্তু সেসময় শিক্ষকরা আমাদের প্রকৃত শিক্ষা দিতেন। এখন হয়তো স্কুলগুলোতে দোতলা-চারতলা ভবন হয়েছে, কিন্তু ভবন থাকলেই হবে না। ভবনগুলো ছাত্রদের জন্য, আর সেই ছাত্রদের প্রকৃত মানুষ করার দায়িত্ব আপনাদের। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।”
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, “আমি গত দেড় মাস যাবৎ এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো স্কুলের সমস্যা বা সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কোনো শিক্ষক আমার কাছে লিখিতভাবে কিছু জানাননি। যেকোনো কাজ করতে হলে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া আছে। আপনারা প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে ইউএনও বা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিতভাবে সমস্যার কথা জানান। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইতিমধ্যেই ২৪-২৫টি স্কুলের সামনে ব্রিজ করে দিয়েছি।”
কলমাকান্দা এলাকার পশ্চাৎপদতার কথা উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, “আমাদের এলাকায় হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, গারো, হাজং সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। এটি দরিদ্রপীড়িত এলাকা। দুর্গাপুরে ‘স্কুল ফিডিং’ চালু থাকলেও কলমাকান্দায় নেই। আমি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর সাথে কথা বলে কলমাকান্দায় স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম চালুর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ এবং ছাত্রীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষার উদ্যোগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “সরকারের কাজ ‘পলিসি বা নীতি’ তৈরি করা, আর তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে আপনাদের।”
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম। এছাড়াও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন শিক্ষক শিউলী চন্দ, বনানী জাম্বিল, মিনহাজ বেগম ও শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকা উপস্থিত ছিলেন।

