Site icon দ্যা মেইল বিডি / খবর সবসময়

জ্বালানি সংকটের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে শিল্প খাতে

দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে শিল্প খাতে। মূলত ডিজেল, পেট্রোল ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদনশীলতা হ্রাস, ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন চেইনে বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে।

শিল্প খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা জানাচ্ছেন, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অনিয়মিত জ্বালানি সরবরাহের কারণে উৎপাদনের সময়সূচি বিপর্যস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন বন্ধ বা আংশিক কমে যাচ্ছে, যা সরাসরি ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হ্রাসে প্রভাব ফেলছে।

এছাড়া, জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং বাজারে অনিশ্চয়তা শিল্প উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ তাদের কাছে বিকল্প জ্বালানির উৎস সীমিত। সরকারের আশ্বাসের পরও বাস্তব চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান শিল্প খাতে উদ্বেগ তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্প খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সময়মতো জ্বালানি সরবরাহ ও নির্ধারিত নীতিমালা কার্যকর করা অপরিহার্য। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, শ্রমিকদের চাকরি এবং সমগ্র অর্থনীতিকেও ঝুঁকিতে ফেলবে। তাই শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা যথাযথ ও নিয়মিত রাখা অত্যন্ত জরুরি।

শিল্পে জ্বালানির সংকটে উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব : দেশের ইস্পাত খাতের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপ প্রতিদিন তাদের কারখানা ও পরিবহন ব্যবস্থার জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমানে প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত জানান, ‘প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হলেও আমরা তার অল্প অংশ পাচ্ছি। একদিন ৯ হাজার লিটার পাওয়া গেলেও পরদিন একেবারেই কিছু পাওয়া যায়নি। এতে উৎপাদন ও সরবরাহ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সরবরাহ শৃঙ্খলে ভাঙন : শুধু উৎপাদন নয়, পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাও এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্প-কারখানাগুলোর নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা মূলত ডিজেলনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি সংকট সরাসরি বাজারে পণ্য সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, যার হাজার হাজার পরিবহন যান রয়েছে, তারাও একই সংকটে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘আমরা আমাদের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ ডিজেল পাচ্ছি। ফলে সব ট্রাক চালানো যাচ্ছে না। এতে বাজারে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।

ছোট ও মাঝারি শিল্পে পরিস্থিতি আরও নাজুক : বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলো বেশি বিপাকে পড়েছে। গাজীপুরের একটি হস্তশিল্প রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ‘লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালাতে ডিজেল দরকার হয়। কিন্তু গত কয়েক দিনে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও তেল পাওয়া যায়নি। এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তৈরি পোশাক খাতেও শঙ্কা : দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও জ্বালানি সংকটের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যদিও এই খাতের অধিকাংশ কারখানা বিদ্যুৎনির্ভর, তবুও লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের এক নেতা বলেন, ‘ঈদের পর পাম্প থেকে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

আমদানি ব্যাহত, হরমুজ প্রণালীর প্রভাব : বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সামপ্রতিক সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় আমদানিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মার্চ মাসে ১৭টি জাহাজে ডিজেল আসার কথা ছিল, এখন পর্যন্ত এসেছে মাত্র ৯টি, একটি জাহাজ পথে রয়েছে, বাকি ৭টির আগমনের সময় অনিশ্চিত।

পাম্পে সংকট, বাড়ছে ভিড় : জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে ভিড় বেড়ে গেছে। অনেক পাম্পে পর্যাপ্ত তেল না থাকায় গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে, পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, কালোবাজারে তেলের প্রবণতা বাড়ছে।

রেশনিং ব্যবস্থা, সমাধান নাকি সাময়িক ব্যবস্থা : ঈদের আগে সরকার জ্বালানি তেলের ওপর রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। যদিও পরে তা তুলে নেয়া হয়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও এই ব্যবস্থা চালুর দাবি উঠেছে। শিল্পমালিকরা বলছেন, সীমিত জ্বালানি সঠিকভাবে বণ্টন করতে হলে রেশনিং ছাড়া বিকল্প নেই। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে বাস্তবতা মেনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কাঁচামাল সংকটও বাড়ছে : জ্বালানির পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। একটি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কাঁচামাল না পাওয়ায় আমরা দ্বিমুখী চাপে আছি।

একদিনের অভিযানে ৮৮ হাজার লিটার অবৈধ জ্বালানি তেল উদ্ধার : সারাদেশে অবৈধভাবে মজুতকৃত জ্বালানি তেল উদ্ধারে সরকারের চলমান অভিযান একদিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, গত সোমবার পরিচালিত অভিযানেই প্রায় ৮৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত তেলের মধ্যে রয়েছে ডিজেল ৬৭,৪০০ লিটার, পেট্রোল ১৩,৮৫৬ লিটার এবং অকটেন ৬৪৪ লিটার।

তিনি বলেন, এই অভিযান দেশে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির অংশ। বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত যথেষ্ট- ডিজেল ১,২৮,৯৩৯ মেট্রিক টন, অকটেন ৭,৯৪০ মেট্রিক টন, পেট্রোল ১১,৪৩১ মেট্রিক টন এবং জেট ফুয়েল ৪৪,৬০৯ মেট্রিক টন, যা মোট ১,৯২,৯১৯ মেট্রিক টন।

এদিন সারাদেশে ৩৯১টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে ১৯১টি মামলা দায়ের এবং ৯,০৩,৫৭০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। চলমান অভিযান মোট ৩,৫৫৯টি অভিযান, ১,২৪৪টি মামলা এবং ৮৪,৫১,০০০ টাকা অর্থদণ্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে। উদ্ধারকৃত মোট জ্বালানি তেল এখন পর্যন্ত ২,৯৬,৩০৫ লিটার, যার মধ্যে ডিজেল ২,৭৩,০৬৫ লিটার, অকটেন ২৮,৯৩৮ লিটার এবং পেট্রোল ৬০,২ লিটার।

সর্বোপরি, শিল্প খাতের কার্যক্রম পুনরায় স্বাভাবিক রাখতে এবং উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে যথাযথ জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারি আশ্বাসের পাশাপাশি কার্যকর তদারকি, বাজারে স্বচ্ছতা এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার প্রবর্তন প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা সমাধান না হলে শুধু শিল্প উৎপাদনই নয়, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ঝুঁকিতে পড়বে। তাই শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সময়মতো জ্বালানি সরবরাহ এবং পরিকল্পিত নীতি বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।

Exit mobile version