নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) নেত্রকোনা কার্যালয়ে সরকারি মালামাল চুরির এক বিশাল সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। স্টোর কিপার, লাইনম্যান এবং কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে চলছে মূল্যবান সরকারি তার (এইচটি লুপ ক্যাবল) চুরির মহোৎসব। চুরির প্রতিবাদ করতে গিয়ে এবং চোরাই মাল বহন করতে অস্বীকৃতি জানানোয় অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত হয়েছেন শেখ মো. রোমান সারোয়ার নামের এক অস্থায়ী চালক।
অন্যদিকে, চুরি করা তারের কভার ছাড়িয়ে তামার অংশ বের করার স্থিরচিত্র এবং চালকের স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও (রাজস্বাক্ষী) ফাঁস হলেও নির্বিকার কর্তৃপক্ষ। বরং চুরির ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করছেন খোদ নির্বাহী প্রকৌশলী। চুরির এত বড় ঘটনা ঘটার পরও এখন পর্যন্ত থানায় কোনো জিডি বা এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়নি।
কারা আছে এ চোর সিন্ডিকেটে?: ফাঁস হওয়া ছবি এবং স্থানীয় সূত্রে ক্যাবল (তার) চোর সিন্ডিকেটের বেশ কয়েকজন সদস্যের নাম ও পরিচয় উঠে এসেছে। তারা হলেন- অফিসের স্টোর কিপার বুলবুল, লাইনম্যান রিপন খান এবং লাইনম্যান হেলপার তানজিল চুরির সাথে সরাসরি যুক্ত। এছাড়াও রানা, নির্বাহী প্রকৌশলীর ড্রাইভারের ভাই হুমায়ুন এবং হুমায়ুনের শ্যালক সানি এ চক্রের সক্রিয় সদস্য। অফিস থেকে ১৭৫ ফুট এসটি কেবল (ST Cable) চুরি করে এ চক্রটি বাইরে বিক্রি করে দিয়েছে। সিন্ডিকেটের এ চুরির বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সহকারী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী নাজমুল হক সাহেবের সম্পৃক্ততার কথাও অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নেত্রকোনা বিদ্যুৎ অফিসে গত ছয় মাস ধরে অস্থায়ী (মাস্টাররোল) চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন শেখ রোমান সারোয়ার। সম্প্রতি তাকে জোরপূর্বক ছুটিতে পাঠানো হয় এবং পরে অঘোষিতভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। রোমানের দাবি অনুযায়ী, গত বছরে ৭ নভেম্বর এ চোর চক্রটি সরকারি তার (ক্যাবল) কেটে তার গাড়িতে করে পাচারের নির্দেশ দেয়। একজন চালক হিসেবে রোমান এমন বেআইনি কাজে বাধা দেন এবং চোরাই মাল নিতে কঠোরভাবে অস্বীকৃতি জানান। অফিসের ভেতরের এই দুর্নীতির সাথে আপস না করার কারণেই ষড়যন্ত্র করে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। দীর্ঘ এক মাস ধরে বেতনহীন অবস্থায় তার পরিবার ও সন্তানরা অনাহারে দিন কাটাচ্ছে বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
শেখ রোমান সারোয়া আরও বলেন, “যারা চুরি করল, তারা বহাল তবিয়তে অফিসে চাকরি করছে, আর আমি চুরি করিনি বলে আজ আমার পেটে লাথি”। তবে তামার তার থেকে প্লাস্টিকের কভার অপসারনের মুহূর্ত ফাঁস হওয়া ছবিতে তিনি শোফায় বসে আছেন দেখা গেছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে নেত্রকোনা বিপিডিবি অফিসের যাতায়াত এবং দুজন ইলেকট্রেশিয়ানের সাথে কথা বলে জানা যায়, চুরি করার পর মাল বিক্রির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে চক্রের সদস্যদের নিজেদের মধ্যেই কোন্দল সৃষ্টি হয়। কোন্দলের জেরেই রানা নামের এক সদস্য তার কাটার গোপনে ধারণকৃত ছবি বাইরে ফাঁস করে দেন। এ ঘটনা একবারই ঘটেছে এমন নয়, আরও কয়েকবার ঘটেছে। তামার ‘এসটি’ এক ফুট ক্যাবলের দাম ৮০-৯০ টাকা হবে বলে উল্লেখ করেন তাদের একজন।
তাদের সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী আমলেই একাধিকবার দামী তার চুরি সাথে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাসহ এ চক্রের সদস্যরা জড়িত। এমনকি শহরে স্থাপিত অধিকাংশ ট্রান্সফরমারে তামার তারের এসটি লুপ ক্যাবল চুরি করেছে এবং সেসব ট্রান্সফরমারে এ্যালুমিনিয়ামের তার দিয়ে সংযোগ স্থাপন করেছে এ চক্রটি।
স্থিরচিত্র গুলোতে দেখা যায়, একটি আবদ্ধ কক্ষের ভেতরে কয়েকজন ব্যক্তি মেঝেতে বসে অত্যন্ত সাবলীলভাবে মোটা কালো বৈদ্যুতিক ক্যাবলের (XLPE) ওপরের প্লাস্টিকের কভার ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছাড়িয়ে ভেতরের মূল্যবান তামার তার বের করছেন। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্যাবলের কাটা কভার প্রমাণ করে যে, চুরি করা তারগুলো এভাবেই স্ক্র্যাপ বা ভাঙ্গারি হিসেবে চড়া দামে বিক্রি করা হয়েছে।
চুরি হওয়া তারগুলো মূলত ট্রান্সফরমারে ব্যবহৃত ১১কেভি ১২০ আরএম ‘এক্সএলপি’ (XLPE) বা ‘এসটি’ (ST) তামার পাওয়ার ক্যাবল। ময়মনসিংহ অঞ্চলে কর্মরত এক নির্বাহী প্রকৌশলীর মতে, এক্সএলপি পাওয়ার ক্যাবল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাধারণত এই তারের ৫০০ মিটারের একটি ড্রামের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার তারও বেশি হবে। এই হিসাবে চুরি যাওয়া তারের কারণে সরকারের বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
এত প্রমাণ থাকার পরও নেত্রকোনা বিপিডিবি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি সম্পূর্ণ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। গত ১ ফেব্রুয়ারি এবং পরবর্তীতে ১১ মার্চ তারিখে নেত্রকোনা নির্বাহী প্রকৌশলী মোহা. সালাহ্ উদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি চুরির বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী জোর গলায় বলেন, “আমাদের তো কোনো তার চুরি হয় নাই। আমার কাছে মাত্র ৫০ মিটার তার আছে”। অন্যদিকে, সহকারী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনিও চুরির সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন এবং বিষয়টি এড়িয়ে যান। উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হক সাহেবকে একাধিকবার মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ না করে উল্টো সংযোগ কেটে দেন।
সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে এমন চুরির ঘটনায় এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়ালে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।


