পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সংহতি ও অভিন্ন উন্নয়ন এগিয়ে নিতে এ সহযোগিতা বিশেষ ভূমিকা রাখে।
কার্যকর সংলাপ ও সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাকে (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারেও সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা বজায় রাখতে দেশগুলোর মধ্যকার মতপার্থক্য বাধা হওয়া উচিত নয়।’
বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা আরও জোরদারে কাজ করছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ গঠনমূলকভাবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জোট (আইওআরএ)-এর কার্যক্রমেও যুক্ত রয়েছে। তিনি আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন।
প্রতিমন্ত্রী বহুপাক্ষিকতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সার্বভৌম সমতা রক্ষা এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততার উদাহরণ হিসেবে তিনি ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের (এপিজি) নির্বাহী কমিটিতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
জলবায়ু ন্যায়বিচার ও নিরাপদ অভিবাসনে গুরুত্ব
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল পররাষ্ট্রনীতির আরও দু’টি প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অভিবাসন কূটনীতির কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সীমিত হলেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে। তাই বাংলাদেশ ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের পক্ষে সোচ্চার থাকবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে আরও বেশি প্রবেশাধিকার এবং সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিতের উদ্যোগও নেবে সরকার।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন নিছক পরিবেশগত উদ্বেগ নয়। এটি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার প্রশ্নও।
অভিবাসনের বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালাল চক্রের শোষণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকার বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তির অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে কাজ করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কূটনীতি প্রচলিত পর্যায়ের সম্পর্কের বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে। এতে যুক্ত হচ্ছে সাংস্কৃতিক বিনিময়, ক্রীড়া, সৃজনশীল শিল্প ও জনগণের মধ্যকার যোগাযোগও।
সমৃদ্ধিই পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের মাপকাঠি
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে হবে দেশের মানুষের জন্য পরিমাপযোগ্য সুফল নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, কূটনৈতিক সাফল্য শুধু আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা দিয়ে পরিমাপ করা ঠিক নয়। করতে হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জাতীয় উন্নয়নে এসব উদ্যোগের অবদান দিয়ে।
শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমাদের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততাকে জাতীয় অর্জনে, অংশীদারত্বকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের উপস্থিতিকে জনগণের জন্য আরও বেশি সুযোগে রূপান্তর করতে সরকার পুরোপুরি অঙ্গীকারবদ্ধ।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু দেশের সাধারণ মানুষ।’
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, টেকসই কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইএসএস-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান।
সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির ও ড. সুফিয়া খানম এবং গবেষণা ফেলো এএসএম তারেক হাসান শিমুল ও আয়েশা বিনতে তৌহিদ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
সেমিনারে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতিক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


