নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ পূর্বধলা সরকারি কলেজে এখন এক থমথমে ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবিতে যখন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা একযোগে সোচ্চার, ঠিক তখনই রাতের আঁধারে ঘটেছে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, ফলাফল বিপর্যয় আর অধ্যক্ষ নিয়োগ ঘিরে সাম্প্রতিক নাটকীয়তায় রীতিমতো উত্তাল হয়ে উঠেছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস।
রবিবার (৪ অক্টোবর) সকাল থেকেই ভিন্ন এক রূপ নেয় পূর্বধলা সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ। সকাল ১০টার দিকে কলেজের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হতে থাকেন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। হাতে ব্যানার, মুখে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার স্লোগান। তাদের মূল দাবি- উপাধ্যক্ষ ও দীর্ঘদিনের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল হক রতনের অপসারণ এবং দ্রুত একজন পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ নিয়োগ।
আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশার সুর। তাদের অভিযোগ, প্রতিবছর এই কলেজে ফলাফলের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটছে, অথচ উত্তরণের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। এর ওপর শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ। এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কলেজের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন স্থানীয় শিক্ষার্থীরা; বাধ্য হয়ে অনেকেই ছুটছেন শহরমুখী। বিক্ষোভকারীদের স্পষ্ট বার্তা- দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক এই আন্দোলন থামবে না।
দিনের বেলায় যখন শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির স্লোগান, তার কয়েক ঘণ্টা আগেই কলেজ ক্যাম্পাসে ঘটে যায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। রবিবার ভোররাত ৩টার দিকে কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষের দরজায় পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।
কলেজের নৈশপ্রহরী মাফিজ উদ্দিনের (৫৫) ভাষ্যমতে, হেলমেট পরিহিত দুই ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটায়। তিনি দ্রুত এগিয়ে গেলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায় এবং তিনি পানি ঢেলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে আগুনে দরজার বেশ কিছু অংশ পুড়ে কালচে হয়ে গেছে। কলেজের সিসিটিভি ক্যামেরাটি নষ্ট থাকায় এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা পুরো বিষয়টিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
অগ্নিকাণ্ডের এ ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল হক রতন বিষয়টিকে তার বিরুদ্ধে চলা ‘ষড়যন্ত্রের অংশ’ বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাকে ফাঁসাতে চাইছে। রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বিষয়টি অবহিত করেছেন। লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তও চেয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা- তাদের শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই কোনো কুচক্রী একটি মহল পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার নাটক সাজিয়েছে।
এরই মাঝে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ক্যাম্পাসে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। ছাত্রদলের কলেজ শাখার সভাপতি রুবায়েত খান শান্তের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল হক রতনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। একই দিনে এমন বিপরীতমুখী ঘটনা ক্যাম্পাসের পরিস্থিতিকে আরও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে।
বর্তমান এই অস্থিরতার বীজ মূলত উপ্ত হয়েছে সম্প্রতি অধ্যক্ষ নিয়োগকে কেন্দ্র করে। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ২০১৮ সালে জাতীয়করণ হওয়া এই কলেজে গত প্রায় আট বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন উপাধ্যক্ষ আনোয়ারুল হক রতন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ২৭ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক মোহাম্মদ আকবর আলীকে এই কলেজের পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তিনি মাউশিতে যোগদানের পর ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর আড়াইটায় কলেজে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বও বুঝে নেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক দিনের মাথায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার বদলি ও পদায়নের আদেশ বাতিল করে দেয়।
এক দিনের ব্যবধানে একজন অধ্যক্ষের পদায়ন বাতিলের ঘটনা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সুধীসমাজের মাঝে তীব্র বিস্ময় ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনিক টানাপোড়েন ও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনাই আজকের বিস্ফোরণের মূল কারণ।
ইতিমধ্যেই পূর্বধলা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। রাতের আঁধারে কে বা কারা, কী উদ্দেশ্যে অধ্যক্ষের দরজায় আগুন দিল- তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে প্রশাসন। তবে সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের একটাই চাওয়া- দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতার অবসান হোক, দূর হোক সকল অনিয়ম এবং পূর্বধলা সরকারি কলেজ ফিরে পাক তার শিক্ষার সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ।


