শাহ আলী তৌফিক রিপন: বাউল-ফকিরের হাতে তিনি তুলে দেন একতারা, দোতারা, খমক কিংবা ঢোল। তার তৈরি নিপুণ আসবাবে সাজে অন্যের বসত, ঘুমানোর প্রশান্তি মেলে তাঁর বানানো খাটে। মাছ ধরার চাঁই থেকে শুরু করে ৩৫ ফুট লম্বা বাঁশের মই- সবই যেন তার জাদুকরি হাতের স্মৃতিতে গাঁথা। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আপন শ্রমে অন্যের জীবনের প্রয়োজন মিটিয়ে চলেছেন যিনি, ৭৮ বছর বয়সে এসেও তার নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু জরাজীর্ণ।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা ইউনিয়নের চকসাদক কোনাপাড়া গ্রামের এক লড়াকু মানুষের নাম আ. সাত্তার। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও, জীবনসংগ্রাম আর শিল্পের প্রতি ভালোবাসায় তার হাতের কাজ আজও থামেনি।
একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বাঁশের খাট, পালং, দরমা, স্যুটকেস ও হাতে তৈরি দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। যান্ত্রিক সভ্যতার দাপটে আধুনিক আসবাব ও কারখানার পণ্য আজ সেসবের জায়গা দখল করেছে। তবু পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া কারুশিল্পের ধ্রুপদি ঐতিহ্য পরম মমতায় আগলে রেখেছেন আ. সাত্তার।
তার ছোট্ট আঙিনার কর্মশালায় উঁকি দিলে চোখে পড়ে স্বরাজ, দোতারা, একতারা, ডুগডুগি, খঞ্জনি, ঢোল ও খমকের মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। শুধু বাদ্যযন্ত্রই নয়; মাছ ধরার চাঁই বা বাইর, পলো, ঝুপড়া, চুপরা, উঁইচ, নানা ধরনের ঘুড়ি এবং বাঁশের টেবিল ও মই তৈরিতেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার।
আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতির ছোঁয়া নেই আ. সাত্তারের কর্মশালায়। তার প্রধান ভরসা লোহার ফ্রেমে নিজের হাতে বানানো একটি খোদাইযন্ত্র, যা চালাতে হয় হাতের টানে। এক পাশে বসে তিনি খোদাই করেন, অন্য পাশে কাউকে দড়ি টানতে হয়। বয়সের কারণে সহকারী রাখা প্রয়োজন হলেও সেই সামর্থ্য তার নেই। পরিচিত কেউ এলে কেবল তখনই একটু সাহায্য পান।
খোদাইয়ের কাজে তিনি ব্যবহার করেন কুইজবাটাল, রাউন্ডবাটাল, সাফবাটাল, বিলসা, মাথিম, করাত, হাতুড়ি, ফিতা ও স্কেল। অভিজ্ঞ হাতে সামান্য একটু ভুলে নষ্ট হতে পারে বাদ্যযন্ত্রের সূক্ষ্ম কারুকাজ। একটি বিদ্যুৎচালিত খোদাইযন্ত্র থাকলে তার শারীরিক পরিশ্রম কমত, কাজের গতিও বাড়ত। অভাবের সংসারে তা কেনা তার কাছে যেন এক বিলাসী স্বপ্ন।
পণ্য বিক্রির জন্য আ. সাত্তারকে হাটে যেতে হয় না। তার কাজের সুনাম এতই যে, ক্রেতারা বাড়িতে এসেই পণ্য কিনে নেন। তিনি এমনিতেই এত কম দাম হাঁকান যে ক্রেতাদের দর-কষাকষির প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু কাঠ, বাঁশ, চামড়া ও ফিতার দাম দিন দিন বাড়লেও, বাড়ে না তার পণ্যের দাম। ফলে হাড়ভাঙা শ্রমের ন্যায্য মূল্য থেকে তিনি বঞ্চিত।
সংসার চলে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার সংক্ষিপ্ত উত্তর, “একদম চলে না।” কাজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো কোনো সঞ্চয় নেই, আবার ৪৫ বছরের মায়ার পেশা ছেড়ে দেওয়ার মতো মনও তার নেই।
চকসাদক কোনাপাড়া গ্রামেই জন্ম তার। বাবা সমর আলী ওরফে লাবু মিয়া ও মা নাইবের মা মারা গেছেন বহু আগে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। ৪০-৪৫ বছর আগে উত্তর মাসকা গ্রামের ঘানি-কারিগর আবদুল জব্বারের কাছে তালিম নিয়েছিলেন, তাকেই ওস্তাদ মানেন। মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ জমিতে স্ত্রী, তিন ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনিসহ ২১ সদস্যের বিশাল পরিবারের বসবাস। তিন ছেলে মিস্ত্রির কাজ করলেও তারা আলাদা থাকেন। জরাজীর্ণ ঘরটি মেরামত করার সামর্থ্যও এই প্রবীণ কারিগরের নেই।
যৌবনে একসময় তিনি নিজেই বৈঠকি বাউল গান করতেন। বয়সের কারণে এখন আর গাইতে পারেন না। তবে তার তৈরি একতারা বা দোতারা হাতে যখন কোনো শিল্পী সুর তোলেন, তখন তার মন আনন্দে ভরে ওঠে। অন্যের কণ্ঠে নিজের সৃষ্টির প্রাণপ্রতিষ্ঠাই তার জীবনের বড় তৃপ্তি।
তবে আক্ষেপের সুরে আ. সাত্তার বলেন, “এসব দেশীয় পণ্য ও কারুশিল্প একসময় চিরতরে হারিয়ে যাবে। এগুলো এখন জাদুঘরে স্থান পাওয়ার যোগ্য।”
দীর্ঘ কর্মজীবনের নীরব সাক্ষী তাঁর স্ত্রী মোছা. আবিয়া খাতুন। স্বামীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “সারাজীবন মানুষটা কষ্টই করল। থাকার মতো একটা ঘর পর্যন্ত নাই।” সরকারের কাছে তার বিনীত প্রত্যাশা- অন্তত একটি নিরাপদ ঘর ও একটি বিদ্যুৎচালিত খোদাইযন্ত্র পেলে জীবনের শেষ দিনগুলো স্বামী একটু শান্তিতে কাটাতে পারতেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হাই, আবদুর রহমান, মনিরুল ইসলামসহ অনেকেই জানান, আ. সাত্তার এই গ্রামের গর্ব। তার কাজ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহযোগিতা পেলে তার শেষ জীবন স্বস্তিতে কাটত এবং তার কারুশিল্প সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া যেত।
বিষয়টি শুধু একজন কারিগরের ব্যক্তিগত অভাবের নয়। যে সমাজ তার হাতের কাজ ব্যবহার করে আনন্দ পায়, সেই সমাজ তার শ্রমের যথাযথ মূল্য দিচ্ছে কি না- তা এক বিরাট প্রশ্ন।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন কেন্দুয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইউনুস জামান রনি। তিনি বলেন, “প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে আমাদের বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। খুব শিগগিরই আমরা আ. সাত্তারকে এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসব।”
একজন কারিগর, যিনি সারাজীবন সমাজের সৌন্দর্য ও সুরের জোগান দিয়েছেন, জীবনের গোধূলিলগ্নে এসে অন্তত একটু স্বস্তি তার প্রাপ্য। একটি নিরাপদ ঘর, কাজের উপযোগী আধুনিক যন্ত্র আর পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে হয়তো বাংলার বিলুপ্তপ্রায় কারুশিল্পের ঐতিহ্য আরও কিছুদিন বেঁচে থাকবে তার হাত ধরে।


