নিজস্ব প্রতিবেদক: অসুস্থ নানিকে দেখতে এসে বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা ভালোবাসার গল্পটা আর বলা হলো না পনেরো বছরের কিশোর নাহিদের। ইট-পাথরের শহর ঢাকা থেকে নাড়ির টানে ছুটে গিয়েছিল নেত্রকোনার কলমাকান্দায়। কে জানত, এই আনন্দময় যাত্রাই হবে তার জীবনের শেষ যাত্রা! নদীর শান্ত জল যে তার জন্য এমন ভয়ংকর রূপ নিয়ে অপেক্ষা করছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কেউ।
রবিবার (৪ অক্টোবর) দুপুরে কলমাকান্দা উপজেলার সদর ইউনিয়নের বৈদ্যগাঁও গ্রামে পানিতে ডুবে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নাহিদ ইসলাম বৈদ্যগাঁও গ্রামের শাহিদ মিয়ার ছেলে হলেও তার বেড়ে ওঠা মূলত ঢাকার উত্তর বাড্ডায়। সেখানকারই একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত সে। কয়েকদিন আগে নানির অসুস্থতার খবর শুনে পরিবারের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে ছুটে আসে নাহিদ।
রবিবার দুপুর ১২টার দিকে বৈদ্যগাঁও গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর পাড়ে সমবয়সীদের সঙ্গে দুরন্তপনায় মেতে উঠেছিল সে। খেলাধুলা শেষে সঙ্গীরা যখন যে যার বাড়ির পথ ধরেছে, নাহিদ তখন একাই ফিরছিল। নদীর পাড় ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ পা পিছলে গভীর পানিতে তলিয়ে যায় সে। শহুরে জীবনে অভ্যস্ত নাহিদ সাঁতার জানত না, তাই বাঁচার আকুতিটুকুও নদীর বুকেই চিরতরে মিলিয়ে যায়।
নাহিদকে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে কিংবা দীর্ঘক্ষণ নিখোঁজ থাকার পর স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন। অচেতন অবস্থায় তাকে নদী থেকে তুলে আনা হয়। বুকে ক্ষীণ আশার আলো নিয়ে স্বজন ও স্থানীয়রা তাকে দ্রুত নিয়ে যান স্থানীয় হাসপাতালে। সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. সৌভিক শ্রাবণ দত্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নাহিদকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকের এই ঘোষণার পর মুহূর্তেই হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে স্বজনদের গগনবিদারী কান্নায়।
যে কিশোরের চোখে ছিল আগামীর রঙিন স্বপ্ন, নদীর নিষ্ঠুর জল যেন তার সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আদরের সন্তানকে অকালে হারিয়ে পাগলপ্রায় নাহিদের মা-বাবা। যে নানিকে দেখতে ঢাকা থেকে ছুটে আসা, সেই নানিও নাতির এমন মৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে গেছেন।
নাহিদের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো বৈদ্যগাঁও গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকেই নয়, কাঁদিয়েছে পুরো এলাকাকে। ঢাকল শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামের স্নিগ্ধতায় ফেরা নাহিদ এখন ঘুমিয়ে আছে গ্রামেরই শান্ত মাটিতে, চিরকালের জন্য।
কলমাকান্দা থানার ওসি সোহেল রানা সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে বিনা ময়নাতদন্তে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে এবং অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।


