দুনিয়ার ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহর স্মরণে ফিরে আসার আহ্বান
সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে শুক্রবার মুসলমানদের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। কর্মব্যস্ত জীবনে মানুষ প্রতিদিন নানা দায়িত্ব, চিন্তা ও প্রয়োজনের পেছনে ছুটে বেড়ায়। জীবিকার সন্ধান, পরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছু মিলিয়ে অনেক সময় আল্লাহর সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা ভাবার সুযোগও হয়ে ওঠে না। জুমার দিন আমাদের সেই ব্যস্ততার মাঝখানেই থেমে যাওয়ার এবং নিজের জীবনের মূল উদ্দেশ্যটি স্মরণ করার একটি সুযোগ তৈরি করে।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-জুমুআহর ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।” এই আয়াতের মধ্যে জুমার দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মানুষ জীবিকার জন্য কাজ করবে, ব্যবসা করবে, নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করবে—এগুলো জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু দুনিয়ার এসব ব্যস্ততা যেন মানুষকে তার স্রষ্টার কথা ভুলিয়ে না দেয়, সেই বিষয়টিই এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রিজিকের জন্য চেষ্টা, তবে রিজিকদাতাকে ভুলে নয়
মানুষের জীবনে অর্থ ও জীবিকার প্রয়োজন রয়েছে। ইসলাম বৈধ উপায়ে উপার্জনকে নিরুৎসাহিত করে না। বরং মানুষকে পরিশ্রম করতে এবং হালাল পথে রিজিক অনুসন্ধান করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে জুমার আজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রিজিকের জন্য আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। এ কারণেই জুমার নামাজের আহ্বান এলে সাময়িকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য দুনিয়াবি ব্যস্ততা ছেড়ে আল্লাহর স্মরণের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে একটি সুন্দর ভারসাম্যের শিক্ষা রয়েছে। ইসলাম মানুষকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বলে না; বরং দুনিয়ার দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে শেখায়।
নামাজ শেষে আবার কর্মজীবনে ফিরে যাওয়ার শিক্ষা
জুমার দিনের শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে পরের আয়াতে। সূরা আল-জুমুআহর ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, নামাজ শেষ হলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে। একই সঙ্গে বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ইসলাম এমন কোনো জীবনব্যবস্থা শিক্ষা দেয় না যেখানে মানুষ শুধু ইবাদত করবে এবং দুনিয়ার দায়িত্ব থেকে দূরে থাকবে। বরং জুমার নামাজের জন্য ব্যস্ততা থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার পর আবার নিজের কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, ইবাদত ও কর্মজীবন পরস্পরের বিপরীত নয়। একজন মুসলমান তার কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী হওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি সচেতন থাকতে পারেন।
জুমা শুধু একটি নামাজ নয়
জুমার দিনকে শুধু সাপ্তাহিক একটি নামাজের দিন হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্যের একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। এটি আত্মপর্যালোচনারও একটি সুযোগ। গত এক সপ্তাহে আমরা কী করেছি? কোথায় ভুল করেছি? কারও প্রতি অন্যায় করেছি কি না? উপার্জনের ক্ষেত্রে আমরা হালাল-হারামের সীমা মেনেছি কি না? পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছি কি না—এসব বিষয় নিয়েও ভাবার সুযোগ করে দেয় জুমার দিন। ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় মানুষ নিজের ভেতরের অবস্থার দিকে তাকানোর সময় পায় না। জুমার দিন সেই সুযোগটি তৈরি করতে পারে।
দুনিয়ার ব্যস্ততা যেন আল্লাহকে ভুলিয়ে না দেয়
আজকের সময়ে মানুষের ব্যস্ততা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নানা ধরনের ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মধ্যে মানুষ সহজেই নিজের আধ্যাত্মিক জীবনের কথা ভুলে যেতে পারে। জুমার দিনের সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষাগুলোর একটি হলো—ব্যস্ততা যতই থাকুক, আল্লাহর জন্য সময় রাখতেই হবে। আমরা জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য সময় নির্ধারণ করি। কিন্তু নিজের স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার জন্যও সময় রাখা প্রয়োজন। জুমার দিন সেই সম্পর্ককে নতুন করে স্মরণ করার একটি সাপ্তাহিক সুযোগ।
আজকের দিনে একটু থামা যাক
জুমার দিনে তাই শুধু নামাজ আদায় করেই দায়িত্ব শেষ না করে নিজের জীবন নিয়েও কিছুক্ষণ ভাবা যেতে পারে। আল্লাহর কাছে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পথে চলার তাওফিক চাওয়া এবং নিজের কাজ ও উপার্জনকে আরও সৎ ও সুন্দর করার সংকল্প করা যেতে পারে। কারণ জীবনের ব্যস্ততা কখনো শেষ হবে না। একটি কাজ শেষ হলে আরেকটি কাজ আসবে, একটি প্রয়োজন পূরণ হলে নতুন কোনো প্রয়োজন তৈরি হবে। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেই যদি মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায়, তাহলে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটিই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। জুমার দিন আমাদের সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়—দুনিয়ার জন্য চেষ্টা করো, কিন্তু দুনিয়ার ব্যস্ততাকে যেন আল্লাহর স্মরণের ওপর প্রাধান্য দিতে না দাও।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল পথে জীবিকা অর্জন করার, তাঁর ইবাদত করার এবং দুনিয়ার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁকে স্মরণ করে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


