কেন্দুয়া প্রতিনিধি: যে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল অকাল বন্যা থেকে ফসল ও মাছ রক্ষার ঢাল হিসেবে, সেই বাঁধই এবার কাল হলো মৎস্যচাষি আলী আহম্মদ খানের। প্রকাশ্য দিবালোকে, যেন অনেকটা সিনেমার কায়দাতেই ১৫-২০টি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে এসে কেটে দেওয়া হলো হাওরের বেড়িবাঁধ। চোখের সামনেই জলের তোড়ে ভেসে গেল তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নের খামার। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ চায়না ও জিমজাল দিয়ে লুট করা হলো বিপুল পরিমাণ মাছ। সব মিলিয়ে মুহূর্তের এমন তাণ্ডবে প্রায় ৫৫ লাখ টাকার সর্বস্বান্ত ক্ষতির মুখে পড়েছেন এই অসহায় মৎস্যচাষি।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের পূর্ব সীমান্ত সংলগ্ন জালিয়া হাওরের কালারিয়া এলাকায়।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কেন্দুয়া থানার ওসি মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, আজই অভিযোগ প্রাপ্তির পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ঘটনাটি সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক। পুলিশ ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে আইনগত কার্যক্রম শুরু করেছে।”
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, গত শনিবার সকাল আনুমানিক ৮টা। হাওরের শান্ত জলরাশিতে হঠাৎই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে ১৫-২০টি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের গর্জনে। ট্রলারগুলোতে ছিল দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত একদল লোক। তারা এসেই কালারিয়া অংশের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে আলী আহম্মদ খানের সত্ত্বদখলীয় নিচু জমিতে থাকা বেড়িবাঁধ ও সংলগ্ন বরনী নদীর পাড় কোদাল দিয়ে কাটতে শুরু করে।
বাঁধ কাটার পরক্ষণেই হাওরে জমে থাকা পানি প্রচণ্ড স্রোতের সৃষ্টি করে বরনী নদীর দিকে ধাবিত হয়। আর সেই স্রোতের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে থাকে আলী আহম্মদের খামারে চাষ করা রুই, কাতল, মৃগেল, গ্লাসকার্প, সরপুঁটি, বোয়াল, শোল, শিং, মাগুর ও কৈসহ বিভিন্ন প্রজাতির লাখ লাখ টাকার মাছ।
ভুক্তভোগীর দাবি, পানির স্রোতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার মাছ ভেসে যায়। তবে হামলাকারীদের তাণ্ডব এখানেই থেমে থাকেনি। বাঁধ কেটে পানি বের করে দেওয়ার পর, সেই স্রোতের মুখে নিষিদ্ধ চায়না জাল ও জিমজাল পেতে তারা প্রায় ৫ লাখ টাকার মাছ লুটে নেয়।
খবর পেয়ে আলী আহম্মদ খান স্থানীয় কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। অভিযোগ উঠেছে, বাধা দিতে গেলে হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্র উঁচিয়ে তাঁদের ধাওয়া করে এবং খুন করে লাশ গুম করার হুমকি দেয়। প্রাণভয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন আলী আহম্মদ ও তার সঙ্গীরা। এ ঘটনায় হাওরপাড়ের সাধারণ মানুষের মধ্যেও চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
এ ঘটনায় কেন্দুয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী আলী আহম্মদ খান। অভিযোগে পার্শ্ববর্তী মদন উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের মামুদ আলীর ছেলে ছদ্দু মিয়াকে (৫৭) প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে এ মামলায়।
তবে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও বিশ্লেষকদের মতে, হাওরের জলমহাল নিয়ন্ত্রণ, মাছচাষ ও জলাশয়ের দখল নিয়ে এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রকাশ্যে এতগুলো ট্রলার নিয়ে এসে এমন পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পেছনে সেই দীর্ঘদিনের বিরোধ বা আধিপত্য বিস্তারের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এখন দেখার বিষয়, পুলিশের তদন্তে ৫৫ লাখ টাকার এমন ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটের নেপথ্যের আসল কুশীলবরা কতটা দ্রুত আইনের আওতায় আসে এবং সর্বস্বান্ত মৎস্যচাষি আলী আহম্মদ খান তার হারানো স্বপ্নের কোনো বিচার পান কি না।


