নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) উদযাপন করেছে তাদের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মাত্রা ও আবেগের জন্ম দিয়েছে, কারণ এটি দলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষমতার আসনে থাকার প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বিগত পতিত সরকারের আমলে নেত্রকোনায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২০২২ সাল ব্যতীত প্রায় সবসময়ই শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হলেও, চার বছর আগের সেই দিনটির কথা আজও ভুলতে পারেননি স্থানীয় নেতাকর্মীরা। ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর নেত্রকোনা জেলার দলীয় কার্যালয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের সময় নেমে আসে ভয়াবহ ও রক্তাক্ত অধ্যায়। সেই রক্তাক্ত দিনের অন্যতম সাক্ষী এবং শিকার- নেত্রকোনার ছাত্রনেতা হুমায়ুন আহমেদ অর্ক।
২০০৩ সালে ছাত্রদলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনীতিতে পা রাখেন হুমায়ুন আহমেদ অর্ক। নেত্রকোনার মদন উপজেলার গাবরতলার (বর্তমানে কেন্দুয়ার মদিনাবাগের বাসিন্দা) মো. তৌহিদুল ইসলামের ছেলে অর্ক দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজেকে রাজপথের আন্দোলনে নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দিয়েছেন। কলেজ ছাত্রদল থেকে শুরু করে নেত্রকোনা জেলা ছাত্রদলের রাজনীতির প্রতিটি স্তরে তিনি ছিলেন নির্ভীক, অদম্য ও বিশ্বস্ত প্রাণ। দীর্ঘ একনিষ্ঠতা ও ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ, ২০২২ সালের ১০ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি মো. ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন শ্যামল স্বাক্ষরিত কমিটির মাধ্যমে তাকে নেত্রকোনা জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নেত্রকোনার তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. ফয়েজ আহমেদ আগস্ট মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে নারকীয় এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নেত্রকোনা পৌর শহরের ছোটবাজার এলাকায় বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকলে পুলিশ বিনা উসকানিতে রাস্তা ফাঁকা করার অজুহাতে বাধা দেয়। আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার থাকা সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ অতর্কিত লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও শটগানের গুলি চালায়।
সেই পুলিশি ক্র্যাকডাউনের সময় গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে স্লোগান দেওয়া অবস্থায় ছাত্রনেতা অর্ককে লক্ষ্য করে কপাল বরাবর সরাসরি গুলি করা হয়। কপালে গুলির আঘাত নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় সহকর্মীদের কাঁধে ভর করে তার ফিরে আসার দৃশ্যটি ছিল ফ্যাসিস্ট আমলের নির্মমতার জ্বলন্ত প্রমাণ।
রক্তাক্ত অবস্থাতেও দমে যাননি অর্ক। তিনি (অর্ক), তখনকার জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন খান রনি, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ মুন্না, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক অনিক মাহবুব চৌধুরীসহ জেলা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও অন্যান্য নেতাকর্মীরা পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। স্মৃতির পাতা উল্টে অর্ক বলেন, “গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও আমরা পিছু হটিনি। একপর্যায়ে পায়ের নিচে টিয়ারশেল মারা হলে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তখন এক হিন্দু ভাইয়ের দেওয়া পানি খেয়ে কিছুটা সামলে উঠি।”
সেদিন নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে শুরু করলে, গ্রেপ্তার এড়াতে অর্ক আহত অবস্থাতেই প্রথমে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও পরে সিএনজি যোগে ময়মনসিংহের একটি মেসে গিয়ে আশ্রয় নেন। ওই দিন রাত ৩টায় ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. আনোয়ারুল হক তার শরীরে অস্ত্রোপচার করেন। এদিকে, এ ঘটনার পর পুলিশ উল্টো যুবদলের তৎকালীন সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন রনিকে প্রধান আসামি করে ৩৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও পাঁচশো জনের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করে।
রক্তে রঞ্জিত হলেও লক্ষ্য থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি অর্ক। বুলেটের সেই ক্ষতকে সাহসের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে তিনি ময়মনসিংহ ও কুমিল্লার ঐতিহাসিক বিভাগীয় সমাবেশ, ঢাকার পল্টন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট এবং গোলাপবাগ মাঠের উত্তাল জনসমাবেশগুলোতে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন। তারুণ্যের রোড মার্চ, জাতীয় ছাত্র ঐক্য সমাবেশ, ২৮ অক্টোবরের পল্টন সমাবেশ, ঢাকা অবরোধ এবং ডামি ভোট বর্জনের ডাকে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে থেকে লড়াই করেছেন তিনি।
রাজপথের পাশাপাশি সাইবার জগতেও তার (অর্ক) ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। জিয়া সাইবার ফোর্সের (জেডসিএফ) নেত্রকোনা জেলার প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকালীন সময়ে দলের সাইবার অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে ৭২ ঘণ্টা স্ট্যান্ডবাই কাজ করার অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে জেডসিএফ এর কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে তাকে গোল্ডেন এওয়ার্ড প্রদান করা হয়। এছাড়াও আপোষনেত্রীর মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা পালনের জন্য বিএনপির তখনকার সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং মানবসেবা সংঘের পক্ষ থেকে তাকে সম্মাননা সনদও প্রদান করা হয়েছে।
২০০৩ থেকে ২০২৬ দীর্ঘ তেইশ বছরের পথচলা কেবল সাধারণ রাজনৈতিক জীবন নয়, বরং ত্যাগ, রক্তদান এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অবিরাম সংগ্রামের জীবন্ত আখ্যান। দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ ও বন্দুকের গুলির মুখোমুখি হওয়ার পর, দলের কাছে নিজের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন চেয়েছেন এই নেতা।
তৎকালীন (১ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রি.) পুলিশ সুপার ফয়েজ আহমেদ জেলা পুলিশের দায়িত্ব থাকাকালীন ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর নেত্রকোনার গুলিবিদ্ধের ঘটনা স্বরণ করে প্রতিবেদককে হুমায়ুন আহমেদ অর্ক বলেন, “আমি (অর্ক) চাই আমাদের নেতা তারেক রহমান দেশের মানুষের জন্য যে ৩১ দফার স্বপ্ন দেখেছেন, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হোক।” একইসঙ্গে দল ও সংগঠনের জন্য যারা জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন, সেসব ত্যাগী কর্মীদের যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়নের দাবি জানান তিনি। আগামী দিনে যুবদলে বা দলের মূল ধারায় যোগ্যতার ভিত্তিতে নিজের শক্ত অবস্থান প্রত্যাশা করছেন নেত্রকোনার রাজপথের পরীক্ষিত এই সৈনিক।


