নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় সরকারি খাদ্য গুদামে নির্ধারিত সময়ের আগেই ধান সংগ্রহ কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে স্থানীয় বাজারে ধানের দামে ধস নেমেছে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে বর্তমান বাজারদরের কোনো সমন্বয় না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। সরকারি গুদামে ধান দিতে না পেরে বাধ্য হয়ে স্থানীয় আড়তদারদের কাছে মাত্র আটশো থেকে সাড়ে আটশো টাকা দরে ধান বিক্রি করছেন তারা, যার ফলে গুনতে হচ্ছে বড় অঙ্কের লোকসান।
খাদ্য অধিদপ্তরের পূর্বনির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের কথা ছিল। গত ৯ আগস্ট অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের টেলিফোন ও খুদে বার্তার নির্দেশনার পর কলমাকান্দায় ক্রয় কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।
কলমাকান্দা খাদ্য গুদাম সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় সরকারিভাবে দুই হাজার ৩১৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত দুই হাজার ১১৫ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, এখনো লক্ষ্যমাত্রার ২০৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ বাকি রয়ে গেছে।
হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে কৃষকদের মাথায় হাত পড়েছে। ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে সার, বীজ, কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সেচ ও শ্রমিকের মজুরি ছিল আকাশচুম্বী। উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেলেও সরকারি সংগ্রহ বন্ধ থাকায় এখন তারা ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। স্থানীয় আড়তগুলোতে কম দামে ধান কেনা হচ্ছে।
অধিকাংশ কৃষকেরই উৎপাদিত ধান দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা এবং আর্থিক সক্ষমতা নেই। উপরন্তু, কৃষিঋণ পরিশোধ এবং দৈনন্দিন পারিবারিক ব্যয় মেটানোর চাপে তারা দ্রুত ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কিছু আড়তদার নামমাত্র মূল্যে ধান কিনে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার নয়াচৈতা এলাকার ক্ষুদ্র কৃষক আব্দুল রাজ্জাক ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারি ধান ক্রয় বন্ধ হওয়ার পর বাধ্য হয়ে অনেকেই আটশো থেকে সাড়ে আটশো টাকা দরে ধান বিক্রি করছেন। এতে ব্যাপক লোকসান হচ্ছে। এ বছর প্রতিদিন কাঠাপ্রতি শ্রমিককে এক হাজার পাঁচশো টাকা দিয়ে ধান কাটিয়েছি। এখনো আটশো টাকা দরে ধান বিক্রি করলে আমার কমপক্ষে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হবে। আমাদের মতো কৃষকদের চলা এখন দায় হয়ে পড়েছে।’
এদিকে, ধান সংগ্রহ বন্ধ হওয়ায় উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের কৃষকরা সরকারি সুবিধা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছেন। বিশেষ করে লেংগুরা ও খারনৈ ইউনিয়নের কোনো কৃষকই খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহ করার সুযোগ পাননি। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন লেংগুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়া এবং খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুল হক।
তারা জানান, কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষকদের বাঁচাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পুনরায় চালুর জোর দাবি জানান এই জনপ্রতিনিধিরা।
সার্বিক বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মুসলিমা বেগম বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের খুদে বার্তার নির্দেশনায় ধান সংগ্রহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এ বছর দুই হাজার ৩১৯ মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে দুই হাজার ১১৫ মেট্রিক টন সংগ্রহ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তবে পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধই থাকবে।’
শুধু কৃষক নন, ধান সংগ্রহ বন্ধ থাকায় স্থানীয় ধান ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের আয়-রোজগারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা দ্রুত সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পুনরায় চালুর পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিয়মিত বাজার তদারকির জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, সরকারি সংগ্রহ আবার শুরু হলে বাজারে ধানের দাম স্থিতিশীল হবে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেয়ে লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।


