নিজস্ব প্রতিবেদক: জীবনের শেষ সায়াহ্নে এসে একটু শান্তিতে ঘুমানোর জায়গা ছিল না তাদের। ভাঙাচোরা চাল দিয়ে গড়িয়ে পড়ত বৃষ্টির পানি। সেই পানি ঠেকাতে পলিথিন আর হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটত বয়োবৃদ্ধ কিরণ হাজং ও পিকুলা হাজং দম্পতির। অভাবের তাড়নায় তরকারি দূরে থাক, শুধু লবণ দিয়ে ভাত খেয়ে দিন পার করেছেন তারা। তিন সন্তান থাকলেও দিনমজুরি করে তাদের নিজেদের সংসারই চলে না। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই দম্পতির কপালে জোটেনি বয়স্ক ভাতাও। অবশেষে চরম দারিদ্র্য আর মানবেতর জীবনযাপন করা হাজং এই দম্পতির মুখে হাসি ফুটেছে।
তাদের চরম অসহায়ত্বের খবর পেয়ে নিজস্ব অর্থায়নে নতুন পাকা-ভিত্তির টিনশেড ঘর নির্মাণ করে উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার এবং কলমাকান্দা-দুর্গাপুর আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় উৎসবমুখর পরিবেশে নিজেরাই ফিতা কেটে ও চাবি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবনির্মিত ঘরটি দম্পতির কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
অসহায় এই দম্পতির করুণ পরিণতির কথা প্রথম সামনে আনেন ২নং দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য রিতা নকরেক। তিনি জানান, তার মেয়ে স্থানীয় কারিতাসের কিশোরী ক্লাবে যেত। সেই সুবাদে তিনি হাজং অধ্যুষিত গ্রাম শ্যামনগর এলাকায় গিয়ে কিরণ-পিকুলা দম্পতির জরাজীর্ণ ঘর ও মানবেতর জীবনযাপ ন দেখতে পান।
রিতা নকরেক বলেন, “বয়স্ক দুজন মানুষ চরম কষ্টে জীবনযাপন করছিলেন। তাদের ঘরবাড়ি ছিল না, খাবার ছিল না। লবণ দিয়ে ভাত খেত তারা। তাদের কষ্ট দেখে আমার খুব মায়া লাগে। এরপর আমি দুর্গাপুর প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের বিষয়টি জানাই। সাংবাদিকরা এসে তাদের লবণ-ভাত খাওয়ার দৃশ্য, ভাঙা ঘর ও পলিথিন মোড়ানো চালের ভিডিও এবং ছবি ধারণ করে খবর প্রচার করেন। আমি কল্পনাও করিনি এত দ্রুত তাদের এই সমস্যার সমাধান হবে। এত দ্রুত ঘরটি নির্মাণ করে দেওয়ায় ব্যাক্তিগতভাবে আমি ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে দুর্গাপুরবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই।”
নতুন ঘর পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত বৃদ্ধ কিরণ হাজং। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা আইসা আমগোর ভাঙা ঘর, ব্যাগ, আর লবণ দিয়া ভাত খাওয়ার ছবি তুইলা নিছিল। বৃষ্টির দিনে পানি পড়লে পলিথিন দিয়া, বাটি দিয়া পানি ঠেকাইতাম। রাইতে ঘুমাইতে পারতাম না। শেষ বয়সে আইসা একটা ভালো ঘরে থাকার স্বপ্ন আছিল, আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হইছে। ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আমগোর স্বপ্ন পূরণ করছেন, তার জন্য দোয়া করি।”
স্ত্রী পিকুলা হাজং বলেন, “আগে অনেক কষ্টে আছিলাম। ভাঙা ঘরে পানি পড়ত। এখন আমরা অনেক খুশি। শেষ বয়সে শান্তিতে থাকবাম। যিনি আমাদের ঘর দিছেন, তিনি যেন আরও বড় মানুষ হতে পারেন, সেই দোয়া করি।” তবে নতুন ঘরে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় তিনি সংশ্লিষ্টদের কাছে বিদ্যুৎ সংযোগের দাবিও জানান।
স্থানীয় হাজং সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দ্বিজেন্দ্র হাজং বলেন, “কিরণ হাজং ও পিকুলা হাজং বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছিলেন। বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও তারা তা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এত দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের জন্য একটি বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়ে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এজন্য আমরা এলাকাবাসী অত্যন্ত আনন্দিত।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জামাল উদ্দিন মাস্টার, দুর্গাপুর সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, কলমাকান্দার লেংগুরা ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. মিলন।
এছাড়াও স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ স্থানীয় হাজং সম্প্রদায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে মহতী উদ্যোগের এই সাধুবাদ জানান।


