জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুরে যৌতুকের এক লাখ টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে পাষণ্ড স্বামী হাফিজুল হককে (৩৯) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ ১৪ বছরের আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারকাজ শেষে সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে জামালপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে, যা ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মামলার বিবরণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফজলুল হকের দেওয়া তথ্যমতে, ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার চর মায়া কলমী গ্রামের বাসিন্দা আমেনা বেগম। জীবিকার তাগিদে তিনি তার দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে রাজধানী ঢাকার মিরপুর এলাকায় বসবাস করতেন এবং সবজির ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। তাদের ভাড়া বাসার পাশেই ছিল কলার আড়ত।
ওই কলার আড়তে কাজ করতেন জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর ইউনিয়নের মেরুরচর গ্রামের মৃত প্রধান মিয়ার ছেলে হাফিজুল হক। পাশাপাশি থাকার সুবাদে আমেনা বেগমের দ্বিতীয় মেয়ে হুনফা আক্তারের সাথে হাফিজুলের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১২ সালে তারা পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে পারিবারিকভাবে তাদের এই বিয়ে মেনে নেওয়া হয়।
তবে বিয়ের পর থেকেই স্বামী হাফিজুল হকের আসল রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। সে স্ত্রী হুনফার পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। দরিদ্র পরিবারটি সেই টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় হুনফার ওপর শুরু হয় অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
যৌতুকের এক লাখ টাকা না পেয়ে ক্ষিপ্ত হাফিজুল ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জামালপুরের বকশীগঞ্জে তার নিজ বাড়িতে স্ত্রী হুনফাকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ঘটনার কিছুদিন পর নিহতের পরিবার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পারে। এরপর ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর নিহতের মা আমেনা বেগম বাদী হয়ে বকশীগঞ্জ থানায় হাফিজুল হককে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের তদন্ত ও চার্জশিট দাখিলের পর মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে চলা এই বিচার প্রক্রিয়ায় আদালত সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষীদের জেরা, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
সোমবার রায় ঘোষণার সময় আসামি হাফিজুল হক আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ পাঁচ লাখ টাকা প্রদানেরও আদেশ দেন আদালত।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি অত্যন্ত শক্তভাবে পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট ফজলুল হক। অন্যদিকে, আসামিপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট মো. মোজাম্মেল হক। দীর্ঘ ১৪ বছর পর হত্যার রায় ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ভুক্তভোগীর পরিবার।


