নিজস্ব প্রতিবেদক: যৌতুকের এক লাখ টাকার দাবিতে অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে স্ত্রী পারভীন আক্তারকে (২৬) হত্যার দায়ে স্বামী শফিকুল ইসলামকে (৪২) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলা থেকে নিহতের শ্বশুর ও শাশুড়িকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে নেত্রকোনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ কে এম এমদাদুল হক এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শফিকুল ইসলাম আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
এ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত শফিকুল ইসলামের বাবা তোরাব আলী (৬৫) এবং মা সখিনা খাতুনকে (৬০) আদালত বেকসুর খালাস দিয়েছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ১০ বছর পূর্বে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার রত্নপুর গ্রামের সোনা মিয়ার মেয়ে পারভীন আক্তারের সঙ্গে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে হয় কলমাকান্দা উপজেলার ক্ষুদ্র সিধলী গ্রামের তোরাব আলীর ছেলে শফিকুল ইসলামের। তাদের দাম্পত্য জীবনে জুনায়েদ হাসান ও জুবাইদ আহমেদ সানি নামের দুটি ফুটফুটে ছেলে সন্তান রয়েছে।
বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই শফিকুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা পারভীনের ওপর যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ শফিকুল তার স্ত্রীর কাছে এক লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। পারভীন ওই টাকা বাবার বাড়ি থেকে এনে দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। নির্যাতন সইতে না পেরে পারভীন তার বাবার বাড়িতে চলে যান।
পরবর্তীতে এলাকার স্থানীয় ইউপি মেম্বার ওয়াহাব মিয়া এবং হাফেজ শামীম আহমেদসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সালিস দরবার হয়। সেখানে শফিকুল ও তার পরিবার ভবিষ্যতে আর যৌতুক দাবি ও নির্যাতন করবে না মর্মে মুচলেকা দিলে বিষয়টি মীমাংসা হয় এবং পারভীন পুনরায় স্বামীর বাড়িতে ফিরে যান।
মীমাংসার এক মাস পার না হতেই নেমে আসে চরম পরিণতি। ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল রাত আনুমানিক ২টা ৫০ মিনিটের দিকে প্রতিবেশী হাফেজ শামীম আহমেদ মোবাইল ফোনে পারভীনের পরিবারকে তার মৃত্যুর দুঃসংবাদ জানান। খবর পেয়ে ঢাকায় মাদ্রাসায় কর্মরত পারভীনের ভাই মো. আবু ইউসুফ, তার বাবা-মাসহ আত্মীয়স্বজন ভোরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, শফিকুলের বাবা তোরাব আলীর চৌচালা টিনের ঘরের দক্ষিণ দুয়ারী বারান্দায় পারভীনের নিথর দেহ পড়ে আছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। যৌতুকের টাকার জন্যই ২৬ এপ্রিল রাতের কোনো এক সময় শফিকুল ও অন্যরা মিলে পারভীনকে মারধর করে হত্যা করেছে বলে স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পারে তার পরিবার।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, পুলিশি তদন্ত, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত আজ (বুধবার) এই রায় প্রদান করেন।
রায়ের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মো. নুরুল কবির রুবেল সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা শেষে আদালত প্রধান আসামি শফিকুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সমাজে যৌতুকলোভীদের জন্য এটি একটি কঠোর বার্তা হয়ে থাকবে।”


