দেশের নতুন প্রজন্মকে মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার গণ্ডি থেকে বের করে দক্ষ, চিন্তাশীল এবং পরিবেশ-সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার।
এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি বিকাশে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ মহোৎসব। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় শিক্ষাঙ্গনে শুরু হতে যাচ্ছে পাঁচ কোটি দেশীয় গাছের চারা রোপণের সবুজায়ন মহাযজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৮ জুন রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত সেরা ১০০টি দলের বিজ্ঞান প্রজেক্ট প্রদর্শনী এবং একযোগে ২৯ হাজার ৬২১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করবেন। প্রযুক্তিগত বিপ্লব ও পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের এই যুগান্তকারী উদ্যোগে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে বড় মাইলফলক অর্জন হবে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
নতুন এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। মাউশির ‘এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিম (ইইএসএস)’ এবং ‘লার্নিং অ্যাক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ (লেইস) প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসূচি দুটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) বলেন, ‘এই কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে গঠনমূলক সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার বিকাশ ঘটাতে চাই। তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন আইডিয়াগুলো থেকে স্থানীয় অনেক সমস্যা স্থানীয়ভাবেই সমাধান করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্টার্টআপের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির পথ উন্মোচিত হবে।’
বৃক্ষরোপণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় শিক্ষার্থীরাই অগ্রসৈনিক হিসেবে কাজ করতে পারে। তারাই আগামীতে জলবায়ু মোকাবিলার মূল হাতিয়ার হবে। সে কারণেই সব কর্মসূচি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করা হয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য আগামীদিনের প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মাঝে জলবায়ু সচেতনতা তৈরি করা, যাতে তারা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের উপযুক্ত অংশীদার হয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।’
মাউশির ইইএসএস স্কিম জানায়, দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সর্বস্তরের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এই মেগা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। মাউশি জানিয়েছে, জাতীয় এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য প্রতি দলে ৩ জন শিক্ষার্থী ও ২ জন শিক্ষক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এই শোকেজিং প্রোগ্রামটি মূলত তিনটি স্তরে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ১২ জুন দেশব্যাপী সব উপজেলা ও থানায় একযোগে এই শোকেজিং প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে। এই পর্যায় থেকে বাছাইকৃত সেরা দলগুলো গত রোববার জেলা পর্যায়ের মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তাদের স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট বা ইনোভেশন আইডিয়া শোকেজিং করে।
মাউশি সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলা ও মহানগর পর্যায় থেকে নির্বাচিত দলগুলো নিয়ে আগামী ২৭ জুন ঢাকায় চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এ পর্বে তৃণমূল থেকে নির্বাচিত ১০০টি দল অংশ নেবে। পরদিন ২৮ জুন রাজধানী ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। এদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেবেন।
মাউশি আরও জানায়, জাতীয় পর্যায়ে প্রজেক্ট প্রদর্শনকারী দলগুলোর মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত সেরা ১০টি দলকে ট্রফি দেওয়া হবে। এছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে আকর্ষণীয় আর্থিক পুরস্কার ও সনদপত্র দেওয়া হবে।
ইইএসএস স্কিম জানায়, শিক্ষকদের আধুনিক ও প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে মেন্টরিংয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ মনোনীত শিক্ষকেরা পুরস্কার হিসেবে পাবেন ৩০ হাজার টাকা এবং একটি সনদপত্র। মনোনীত শিক্ষার্থীরা তাদের সৃজনশীল উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ পাবে ২০ হাজার টাকা এবং একটি যোগ্যতা সনদপত্র।
এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিম (ইইএসএস)-এর পরিচালক প্রফেসর মো. তোফাজ্জেল হোসেন বাসস’কে জানান, গত ১২ জুন উপজেলা পর্যায়ের এবং ১৪ জুন জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জেলা পর্যায় থেকে নির্বাচিত সেরা ১০০টি দল নিয়ে আগামী ২৭ জুন ঢাকায় চূড়ান্ত মূল্যায়ন পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এদিন বিচারকগণ গোপন ব্যালটের মাধ্যমে বিজয়ী দলগুলো নির্বাচন করবেন। পরদিন ২৮ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা এবং পুরস্কার বিতরণ করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে জীবনমুখী শিক্ষা নিশ্চিত, মৌলিক মূল্যবোধ সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া এবং জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এই স্কিমের প্রধান উদ্দেশ্য। এর বাইরে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নিশ্চিত করা, ‘আনন্দের সাথে শিক্ষা’ বা ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নিশ্চিত করা, সু-শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিভাবান শিক্ষক তৈরি করা, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশের পথ উন্মুক্ত করা এবং সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া।
শুরু হচ্ছে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি
এদিকে শোকেজিং কর্মসূচির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের শিক্ষাঙ্গনে শুরু হতে যাচ্ছে সবুজায়ন মহাযজ্ঞ। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে ‘লার্নিং অ্যাক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে দেশের স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে পাঁচ কোটি দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মাউশি লেইস প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি শিশুকে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণে সম্পৃক্ত করতে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এই কর্মসূচিতে আম, জাম, কাঁঠাল, নিম ও অর্জুনের মতো দেশীয় গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
মাউশির জনায়, আগামী ২৮ জুন দেশের ১৮ হাজার ৯০৭টি বিদ্যালয়, ১ হাজার ৪৪৬টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ৯ হাজার ২৬৮টি মাদ্রাসাসহ মোট ২৯ হাজার ৬২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে এই কর্মসূচি শুরু হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের মূল ক্যাম্পাসে একটি গাছ রোপণ করবেন এবং একই সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে দেশজুড়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একযোগে সেই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
লেইস প্রকল্পের পরিচালক প্রফেসর মো. আসাদুজ্জামান বাসস’কে জানান, দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি একযোগে সারাদেশে সম্প্রচার করা হবে। এর মধ্যে দেশের ১০০টি বিশেষ সেন্টারে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সের ব্যবস্থা থাকবে। প্রধানমন্ত্রী চাইলে সরাসরি মাঠপর্যায়ের যেকোনো সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘উদ্বোধনের দিন প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম তিনটি করে গাছ লাগানো হবে। যার মধ্যে একটি ফলদ ও একটি বনজ গাছ থাকবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে পাঁচ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি সম্পন্ন করা হবে।


