শেখ শামীম: ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার হাওরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। উপজেলার নাগডড়া এলাকার ফুলবাইন বাঁধ ভেঙে অনবরত পানি প্রবেশ করছে হাওরে। এতে চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের কষ্টার্জিত পাকা বোরো ধান, হাওরজুড়ে এখন শুধুই কৃষকের হাহাকার।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নতুন করে বৃষ্টি না হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিকেল ৫টার দিকে ডাকবাংলো পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ০.৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা পুরো হাওরাঞ্চলকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
টানা বৃষ্টি ও ঢলে উব্দাখালী, মহাদেও, গণেশ্বরী ও মঙ্গেলশ্বরীসহ প্রায় সব নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উপচে পড়া পানিতে সোনাডুবি, মহিশাশুরা, গোরাডোবা, পেটকি, সাইডুবি, মেদী, তেলেঙ্গা ও আঙ্গাজুরাসহ অন্তত ১৫টি হাওর ও বিলে পানি ঢুকে পড়েছে। স্থানীয়দের মতে, এরই মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে কলমাকান্দায় ২১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলেই রয়েছে চার হাজার ৬৩০ হেক্টর জমি। সরকারি হিসাব বলছে, এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯৫০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
ধান কাটার ক্ষেত্রেও রয়েছে অমিল। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের দাবি, বাস্তবে ধান কাটা হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশের মতো। এর মধ্যে একটি বড় অংশই এখন পানির নিচে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক সংকট। চান্দুয়াইল গ্রামের কৃষক রেজাউল করিম রজব আক্ষেপ করে বলেন, “আমার ১০ একর জমির মধ্যে মাত্র এক একর ধান কাটতে পেরেছি। বাকি সব পানির নিচে চলে গেছে। এক বছরের কষ্ট এক রাতেই শেষ হয়ে গেল।” সময়মতো ধান কাটতে না পারায় কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, “ফুলবাইন বাঁধটি মেরামতের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহারে সমন্বয় করা হচ্ছে।”
তবে স্থানীয়রা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত বাঁধ মেরামত, পর্যাপ্ত হারভেস্টার সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। তা না হলে এই বিপুল ক্ষতির ভার বহন করা হাওরের কৃষকদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
