নিজস্ব প্রতিবেদক: জ্বালানি তেলের সুষম বন্টন, অপচয় রোধ, অবৈধ মজুতদারি বন্ধ এবং গ্রাহকদের ভোগান্তি লাঘবের লক্ষ্যে নেত্রকোনায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডিজিটাল ফুয়েল কার্ড’ ব্যবস্থার উদ্বোধন করা হয়েছে। ফুয়েল কার্ড ছাড়া আগামি ১৭ এপ্রিলের পর অর্থাৎ ১৮ এপ্রিল থেকে পেট্রোল পাম্প বা ডিলারবৃন্দের কাছ হতে জ্বালানী সংগ্রহ যাবে না বলে জানানো হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টায় নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ কার্ডের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।
তবে আজ থেকে https://fuelcardnetrokona.com নামক ওয়েবে প্রবেশ করে কার্ড প্রাপ্তি জন্য আবেদন করা যাবে। আবেদন প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনওবৃন্দ যাচাইয়ের পর অনলাই্নেই আবেদনটি অনুমোদন করবেন। পরে আবেদনকারীদের নিজ দায়িত্বে কার্ডটি প্রিন্ট করে দুই কপি ছবিসহ সংশ্লিষ্ট ইউএনও মহোদয়ের সীল ও স্বাক্ষর গ্রহণ করতে হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান, পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) ওয়াহিদুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, আজ কার্ডটির সফট বা আংশিক উদ্বোধন করা হলো। তবে আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে এ ব্যবস্থাটি জেলাজুড়ে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে। তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন, “আগামী ১৮ তারিখের পর থেকে নেত্রকোনায় ফুয়েল কার্ড ছাড়া কোনো গ্রাহককে জ্বালানি তেল প্রদান করা হবে না।”
তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগের ফলে একই ব্যক্তির বারবার তেল নেওয়া বা ‘ডুপ্লিকেশন’ বন্ধ হবে এবং জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত হবে। প্রথম ১০-১২ দিন এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকবে এবং পরবর্তীতে যেকোনো ত্রুটি সংশোধন করে স্বয়ংক্রিয় ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা হিসেবে দাঁড় করানো হবে।
পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম তার বক্তব্যে বর্তমান বৈশ্বিক সংকট এবং জ্বালানি তেলের সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের অন্তত ৩০ শতাংশ জ্বালানি ব্যবহার কমাতে হবে। অনেকেই দেখা যাচ্ছে সকালে তেল নিয়ে বিকেলে আবার নিচ্ছেন, অথবা বোতলে ভরে দোকানে বিক্রি করছেন। এসব ব্যক্তিগত অসততা রোধ করতেই ফুয়েল কার্ডের উদ্যোগ।”
তিনি আরও জানান, প্রথম কয়েকদিন ফুয়েল কার্ড না থাকলেও ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির রেজিস্ট্রেশন পেপার দেখে তেল দেওয়া হবে। তবে এরপর প্রশাসন কঠোর অবস্থানে যাবে। একইসাথে মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এই সিস্টেমটির কারিগরি দিক ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান জানান, গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি কমাতে এবং জ্বালানি সরবরাহে স্বচ্ছতা আনতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি এই সিস্টেমের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেন।
বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- জেলার ১৮টি ফিলিং স্টেশনে কখন কতটুকু তেল মজুত আছে বা বিক্রি হচ্ছে, তা একটি সেন্ট্রাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম মনিটরিং করা হবে। গ্রাহকরা সহজেই জানতে পারবেন কোন পাম্পে কতটুকু তেল আছে। ঘরে বসেই অনলাইনে ফুয়েল কার্ডের জন্য আবেদন করা যাবে এবং ট্র্যাকিং নম্বরের মাধ্যমে আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা জানা যাবে। সড়ক দুর্ঘটনার কথা মাথায় রেখে এই ডেটাবেসে গ্রাহকদের রক্তের গ্রুপ যুক্ত করা হয়েছে, যাতে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত রক্তের সন্ধান পাওয়া যায়। কেউ যদি অবৈধভাবে তেল মজুত করে, তবে সাধারণ নাগরিকরা সিস্টেমের ‘নাগরিক কর্নার’ ব্যবহার করে পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানাতে পারবেন। তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
উদ্বোধনী এ অনুষ্ঠানে নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের মালিক ও ডিলারবৃন্দ, স্থানীয় রাজনৈতিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জেলা প্রশাসনের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নেত্রকোনা জেলায় জ্বালানি ব্যবস্থাপনা মডেল হিসেবে দেশের অন্যান্য স্থানেও উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারবে।
