ইমন সরকার, ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:
পহেলা বৈশাখের আগমনী বার্তায় ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের পালপাড়া যেন আবারও ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য। মাটির ঘ্রাণে ভরা এই জনপদে ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই শুরু হয় চাকার ঘূর্ণন যা থামে কেবল সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে। বৈশাখকে ঘিরে বাড়তি চাহিদাই যেন নতুন করে প্রাণ জুগিয়েছে বহুদিনের সংগ্রামে টিকে থাকা এই মৃৎশিল্পীদের। সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো পালপাড়া জুড়ে এক নীরব অথচ প্রাণবন্ত কর্মযজ্ঞ।
পরিবার-পরিজন মিলে কেউ এঁটেল মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ নিপুণ হাতে গড়ে তুলছেন পিঠা বানানোর খোলা, হাঁড়ি-পাতিল কিংবা নান্দনিক খেলনা। অন্যদিকে রোদে শুকানো পণ্যে রংতুলির আঁচড়ে প্রাণ দিচ্ছেন নারীরা তাদের হাতের সূক্ষ্ম কারুকাজে সাধারণ মাটিও হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় শিল্পকর্ম। শিশুরাও পিছিয়ে নেই; ছোট ছোট কাজে সহায়তা করে তারা যেন ধীরে ধীরে শিখে নিচ্ছে পূর্বপুরুষদের এই ঐতিহ্য। হাঁস, ঘোড়া, গরু, পাখি ও মাছের আদলে তৈরি খেলনাগুলোয় ফুটে উঠছে গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও নান্দনিকতা। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে মাটির ব্যাংক ও পুতুল যা এখনও অনেক পরিবারের কাছে নস্টালজিয়ার প্রতীক।
তবে এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর টিকে থাকার সংগ্রাম। চান্দরাটি পালপাড়া গ্রামের অভিজ্ঞ মৃৎশিল্পী প্রফুল্ল পাল বলেন, “মৃৎশিল্পের মূল উপকরণ এঁটেল মাটি এখন সহজে পাওয়া যায় না। দূর-দূরান্ত থেকে আনতে হয়, খরচও বেশি। জ্বালানি কাঠের সংকট তো আছেই। এত কষ্টের পরও যে দাম পাই, তাতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্মও আগ্রহ হারাচ্ছে।” একই গ্রামের গৃহিণী শ্যামলী পাল জানান, “আমরা ঘরের কাজের ফাঁকে এসব পণ্য রং করি। সারা পরিবার মিলে কাজ করি বলেই কোনোভাবে টিকে আছি। কিন্তু বাজারে প্লাস্টিকের জিনিসের সাথে পাল্লা দেওয়া খুব কঠিন।” স্থানীয় এক ক্রেতা জানান, “মাটির জিনিসের যে সৌন্দর্য আর পরিবেশবান্ধব দিক আছে, তা অন্য কোনো পণ্যে নেই।
কিন্তু এখন এগুলো সহজে পাওয়া যায় না, আর দামও তুলনামূলক বেশি মনে হয়।” ঐতিহ্যগতভাবে মাটির তৈজসপত্র ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রায় শত বছরের বেশি সময় ধরে পালপাড়ার মানুষ এই পেশাকে ধারণ করে আসছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক, সিরামিক, মেলামাইন ও স্টিলের পণ্যের আগ্রাসনে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এই শিল্প। বছরে ঈদ, পূজা ও বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে সাময়িক চাহিদা তৈরি হলেও বছরের বাকি সময়টা কাটে অনিশ্চয়তায়।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে নির্মম। একটি মাটির পণ্য তৈরি করতে যে পরিমাণ শ্রম ও খরচ লাগে, তার তুলনায় লাভ খুবই সামান্য। অনেক ক্ষেত্রেই পাইকারি বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হন কারিগররা। অনলাইন বাজার বা আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ না থাকায় তাদের পণ্যের বিস্তৃত বাজারও তৈরি হচ্ছে না। পালপাড়া মৃৎশিল্পী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক অমূল্য পাল বলেন, “কোনোভাবে বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছি।
আগের মতো চাহিদা নেই। শুধু বৈশাখ বা পূজার সময় কিছুটা বিক্রি বাড়ে। সরকারি সহায়তা না পেলে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা খুব কঠিন হয়ে যাবে।” এদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও সহায়তা পেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ভালুকা সরকারি কলেজের প্রভাষক জাহিদুল ইসলাম সুবীন বলেন, “মৃৎশিল্পীদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করা গেলে তারা নতুনভাবে সম্ভাবনা খুঁজে পাবেন।
একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে মাটির জিনিসের চাহিদা বাড়ানোর উদ্যোগও জরুরি।” বর্তমান বিশ্বে যখন প্লাস্টিক দূষণ বড় এক উদ্বেগের নাম, তখন মাটির পণ্য হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প। কিন্তু যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পনার অভাবে সেই সম্ভাবনা এখনও অপূর্ণই রয়ে গেছে। বৈশাখের রঙিন আবহে পালপাড়ার চাকার ঘূর্ণন আজও আশার গল্প শোনায়। কিন্তু সেই ঘূর্ণন কতদিন অব্যাহত থাকবে তা নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর। কারণ, এই চাকা থেমে গেলে থেমে যাবে শুধু একটি পেশা নয়, থেমে যাবে বাঙালির শতাব্দী প্রাচীন এক গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাও।
