ইবি প্রতিনিধি:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করেন নিহত শিক্ষিকা রুনার খুনি ফজলুর রহমান। শুরু থেকেই ফজলুর সঙ্গে দহরম মহরম ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ আওয়ামীপন্থী শিক্ষক নেতাদের। বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ আওয়ামীলীগ নেতা সাবেক প্রোভিসি ও ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ড. শাহিনুর রহমান এ বিভাগে ফজলুকে নিয়োগ দেন। এক সাধারণ ফজলু থেকে খুনি ফজলু হওয়ার পিছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দায়ী করছেন অনেকে। এর আগে ফজলু বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে কাজ করতো এবং ইংরেজি বিভাগে তার যাতায়াত ছিল বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সমাজকল্যাণ বিভাগে কাজ করার সুবাদে পরবর্তীতে বিভাগটির সাবেক সভাপতি ও আওয়ামীপন্থী শিক্ষক শ্যাম সুন্দর সরকার, আওয়ামী কর্মকর্তা সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ এর সঙ্গে যোগসাজশে আর্থিক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে ফজলুর রহমান। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আসমা সাদিয়া রুনা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পরেও তারা আর্থিক অনিয়ম চালিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্যাম সুন্দর শিক্ষিকা রুনাকে দায়িত্ব হস্তান্তরকালে আর্থিক আয়-ব্যয় হিসাবও বুঝিয়ে দেননি।এই অনিয়মের লাগাম টেনে ধরেন আসমা সাদিয়া রুনা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রুনার সঙ্গে দুর্ব্যবহার, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, অসহযোগিতা এবং তাকে ব্যর্থ সভাপতি হিসেবে প্রমাণ করতে নানা চক্রান্ত চালায় তারা। ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের সহযোগিতায় বিভাগটির সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ ও খুনী ফজলুকে বদলি করা হয়। এরই জের ধরে বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তার প্ররোচনায় গত ৪ মার্চ ফজলুর হাতে শিক্ষিকা রুনা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
জানা যায়, সমাজকল্যাণ বিভাগের যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালে। ওই সময় বিভাগের সভাপতি হিসেবে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি প্রফেসর ড. শাহিনুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেসময় ফজলুকে মাসিক ৬ হাজার টাকায় বিভাগে কাজের সুযোগ করে দেন তিনি। কিন্তু পরবর্তীতে ওই বেতনে সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি ফজলু। ফলে ফজলুর চাহিদা মোতাবেক বিভাগীয় সভাপতি আসমা সাদিয়ার লিখিত নোট প্রেরণ ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. রোকসানা মিলির মৌখিক আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে ডে-লেবার হিসেবে কাজের অনুমতি দেন ভিসি প্রফেসর ড. নকীব মুহাম্মদ নসরুল্লাহ। এরপর তিনি এক মাস সমাজকল্যাণ বিভাগে কাজ করেন। তবে বিভাগীয় সভাপতির সঙ্গে বাজে আচরণের জন্য তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট অভিযোগ জানানো হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফজলু নিজেই বদলির আবেদন করায় তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি ওবায়দুল হকেরও লিখিত সুপারিশ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ড. আকতারুল ইসলাম (জিল্লু) বলেন, “অনেক আগে আমার বাসায় অবস্থিত ঝিনাইদহ ক্লাবে সে ছিল। ৭-৮ দিন মতো কাজ করে। মূলত সে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবেই কাজ করতো। অল্প টাকা পাওয়ায় পরে তাকে প্রফেসর শাহিনুর রহমান সমাজকল্যাণ বিভাগে নিয়ে যায়। তখন শাহিনুর রহমান ওই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। শাহিনুর রহমানের সঙ্গে তার কিভাবে সম্পর্ক এটা আমি জানি না। ইংরেজি বিভাগে সে যাতায়াত করতো কিনা এটাও আমার জানা নেই।”
এ বিষয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. রোকসানা মিলি বলেন, “আসমা সাদিয়া রুনা এবং আমি তার ফাইল নিয়ে ভিসি স্যারের কাছে যাই এবং তাকে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নথিভুক্ত করার অনুরোধ জানাই, স্যার এটি করে দেন। তবে পরবর্তীতে রুনার সঙ্গে অসদাচরণ করলে একাডেমিক কমিটির মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাকে বদলি করা হয়। তবে ওই ছেলেটা এ বিভাগে থাকার জন্য মরিয়া ছিল। কি কারণে ছিল সেটি আমার বুঝে আসে না। তবে রুনাকে বারবার অনুরোধ করা হলেও তাকে ওই বিভাগে আর নিতে চায়নি। হয়তো আচরণটা খুব বেশি খারাপ করেছিল। বিশ্বজিৎও তার সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করতো এবং বিভাগের সভাপতি হিসেবে মূল্যায়ন করতো না।”
এ বিষয়ে জানার জন্য বিভাগের সাবেক সভাপতি শ্যাম সুন্দর সরকারকে কল করা হলে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
সমাজকল্যাণ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী জোর্শেদ করিম অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের বিভাগের আন্ত:কোন্দল অনেক আগে থেকেই। ম্যাম সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ম্যামকে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য বিভাগের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষক জড়িত ছিল। এক সাধারণ ফজলু থেকে খুনী ফজলু হওয়ার পেছনে আমাদের শিক্ষক-কর্মচারীরা দায়ী। আমার ম্যাম সৎ মানুষ ছিলেন। কোন জায়গায় কয় টাকা ব্যয় হয়েছে, বিভাগীয় খরচের ভাউচার বিল ভালোভাবে যাচাই বাছাই করতেন। তবে এর আগে যারা চেয়ারম্যান ছিল বা দায়িত্বে ছিল তারা ভাগ করে টাকা পয়সাগুলো খাইতো। কিন্তু এখন খাইতে পারছে না বলে আমার ম্যামের ওপর চড়াও হয়েছে। এটাই হলো সত্য কথা। ফজলুর কল লিস্ট চেক করা হোক এবং বিভাগের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জবাবদিহি করা হোক সত্য বের হয়ে আসবে।”
