শেখ শামীম: নেত্রকোনা কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুরা ইউনিয়ন পরিষদে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় চরম ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের ঘোষণাপত্র ও দপ্তর আদেশের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হলেও, সেখানে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আদালতের নির্দেশনার পর এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কৌতূহল ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, রিট আবেদন নম্বর- ১০৭২/২০২৬-এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছেন। রুলে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ধারা ১০১ ও ১০২ অনুযায়ী জারি করা ঘোষণাপত্র ও দপ্তর আদেশ কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না- সংশ্লিষ্টদের কাছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গত ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি করা সংশ্লিষ্ট আদেশের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছেন আদালত এবং আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রিটকারী ও লেংগুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূইয়া জানান, তিনি আদালতের স্থগিতাদেশের অনুলিপি সংযুক্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর ইতোমধ্যে আবেদন করেছেন। তাঁর দাবি, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ বলবৎ থাকায় আইনগতভাবে তিনিই এখনো চেয়ারম্যান পদে বহাল রয়েছেন। তিনি বলেন, “আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত আমার দায়িত্ব পালনে আইনত কোনো বাধা নেই।”
এদিকে, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকার পরও প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে লেংগুরা ইউনিয়নে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, “আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে দায়িত্ব পালন করছি। আদালতের আদেশের বিষয়টি সম্পর্কে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো অবগত নই।”
সার্বিক বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
অন্যদিকে, হাইকোর্টের এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আপিল দায়ের করা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক সরাসরি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। তবে তিনি জানান, এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন যে, স্থগিতাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুলিপি এখনো তাঁদের হাতে পৌঁছেনি।
আইনজীবীদের মতে, আদালতের স্থগিতাদেশ কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট ঘোষণাপত্র ও দপ্তর আদেশের বাস্তবায়ন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার কথা। এ অবস্থায় প্রশাসনিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে তা নতুন আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে, প্রশাসনের কাছে আদেশের আনুষ্ঠানিক অনুলিপি পৌঁছানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলেও মত দিচ্ছেন কেউ কেউ।
এদিকে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন এবং আদালতের নির্দেশনার মধ্যে দ্রুত সমন্বয় না হলে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে অচলাবস্থা দেখা দেবে। এতে করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সেবা প্রাপ্তি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এখন সবার দৃষ্টি আগামী চার সপ্তাহ পর নির্ধারিত রুল শুনানির দিকে। সেদিন আদালত কী অবস্থান নেন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা আসবে কি না, নাকি দ্বৈত অবস্থানের কারণে ধোঁয়াশা আরও বাড়বে- তা নিয়েই চলছে আলোচনা। আইনি ব্যাখ্যা ও আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার স্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত লেংগুরা ইউনিয়নে এই অনিশ্চয়তা আপাতত কাটছে না।
