নিজস্ব প্রতিবেদক: বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে তিনি মানুষের জীবন বাঁচানোর ব্রত নিয়েছেন। বনোয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডের ‘সাফা ফার্মেসি’তে নানা রোগের উপশম খুঁজতে আসতেন এলাকার সাধারণ মানুষ। সাদা চোখে তিনি একজন সম্মানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী। জীবনরক্ষাকারী সেবার আড়ালেই তিনি পেতেছিলেন তরুণ সমাজকে ধ্বংসের এক ভয়ংকর ফাঁদ। তিনি মো. এ এস এম সায়েম ওরফে অভি (৩৭)। দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের ব্যবসার আড়ালে গোপনে চালিয়ে আসছিলেন রমরমা মাদকের কারবার। অবশেষে নেত্রকোনা মডেল থানা-পুলিশের বিশেষ অভিযানে উন্মোচিত হলো তার দ্বৈত সত্তার মুখোশ।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দিনগত রাতের ঘটনা। চারদিক তখন নিস্তব্ধ, ঘড়ির কাঁটায় রাত ১টা ৪৫ মিনিট। পুলিশের কাছে গোপন সংবাদ আসে, নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ সড়কের পারলা মোড় এলাকায় অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে মাদকের চালান হাতবদল হতে যাচ্ছে। তথ্যের সত্যতা যাচাই করে কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিক সেখানে অবস্থান নেয় থানা-পুলিশের একটি দল।
শুরু হয় পুলিশের সতর্ক তল্লাশি। একপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সায়েমের সাথে থাকা কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় সহযোগী অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সুকৌশলে পালিয়ে যায়। তবে শেষ রক্ষা হয়নি মূল হোতার। ধাওয়া করে পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয় সাফা ফার্মেসির মালিক সায়েমকে।
আটকের পর তার দেহ ও সঙ্গে থাকা জিনিসপত্রে তল্লাশি চালাতেই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। উদ্ধার করা হয় ৫০ পিস মরণঘাতী ইয়াবা ট্যাবলেট। পাশাপাশি তার কাছ থেকে মাদক বিক্রির নগদ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা, মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল এবং কারবারের কাজে ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল ফোন জব্দ করে পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্রেপ্তার সায়েম নেত্রকোনা সদর উপজেলার বনোয়াপাড়া নেওয়াজনগর এলাকার নুরুল হকের ছেলে। সামাজিকভাবে নিজেকে তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত ফার্মেসি ব্যবসায়ী হিসেবেই পরিচয় দিতেন। যেহেতু পেশাটি ওষুধের, তাই সাধারণ মানুষের মনে তাকে ঘিরে কখনো বিন্দুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক হয়নি। আর ‘সাদা লেবাস’ ও বৈধ ব্যবসার সাইনবোর্ড ব্যবহার করেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গোপনে ইয়াবা সংগ্রহ করে জেলার বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ ও খুচরা বিক্রি করে আসছিলেন।
চিকিৎসাসেবার মতো একটি মহান ও আস্থার পেশার আড়ালে এমন ভয়ংকর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর বুধবার সকালে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেকেই এমন প্রতারণায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়রা মনে করছেন, সমাজের এমন ছদ্মবেশী অপরাধীদের কারণেই তরুণ সমাজ আজ অবক্ষয়ের মুখে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের জানান, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিযানটি পরিচালিত হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সায়েমের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ওসি আরও জানান, রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়া অন্যান্য সহযোগীদের ধরতে পুলিশের গোয়েন্দা জাল বিছানো রয়েছে। তাদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। মাদকের বিরুদ্ধে নেত্রকোনা জেলা পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা দৃঢ়তার সঙ্গে পুনরুল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক না কেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।




