মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩

নিজস্ব প্রতিবেদক: জলবায়ু পরিবর্তনের চরম অভিঘাত, মাঠে মাঠে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার আর দিন দিন অনিরাপদ হয়ে ওঠা খাদ্যব্যবস্থা- সব মিলিয়ে গভীর সংকটের মুখে আমাদের কৃষি। খাদ্য উৎপাদনে পরিমাণগত সাফল্য এলেও, টেকসই ও নিরাপদ খাদ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। এই সংকট থেকে উত্তরণের অন্যতম পথ হতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে সুর মিলিয়ে চাষাবাদ বা ‘এগ্রোইকোলজি’ (কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা)। একইসঙ্গে কৃষিতে নারীর ঘাম ঝরানো শ্রমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজ সময়ের দাবি।

এমন এক বাস্তবতাকে সামনে রেখে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সময়োপযোগী এক আঞ্চলিক সংলাপ। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সেমিনার কক্ষে ‘খাদ্য ব্যবস্থা, আঞ্চলিক বাস্তবতা ও এগ্রোইকোলজির পথ: ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই ভবিষ্যতের সন্ধানে’ শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করা হয়।

বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক’ এবং ‘রোজা লাক্সেমবার্গ স্টিফটুং সাউথ এশিয়া’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সংলাপে ময়মনসিংহের হাওর, পাহাড় ও সমতল ভূমির কৃষিপ্রতিবেশ রক্ষায় এবং জীবন ও পরিবেশ বাঁচাতে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবি জানানো হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন বারসিকের নেত্রকোনা অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান। এরপর মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে কৃষির বর্তমান সংকট ও উত্তরণের উপায় নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানের বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহীদুল ইসলাম। তার উপস্থাপনার পরই শুরু হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের প্রাণবন্ত উন্মুক্ত আলোচনা।

সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মাসুম আহমাদ এক রূঢ় বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা এখন প্রচুর খাদ্য উৎপাদন করছি ঠিকই, কিন্তু সেই খাদ্য কতটা নিরাপদ ও আমাদের কৃষি কতটা টেকসই, তা নিয়ে আমরা ভাবছি না। এমনকি কৃষিতে নারীদের যে বিশাল অবদান রয়েছে, আমরা তার স্বীকৃতিও দিতে চাই না।”

আধুনিক কৃষির নেতিবাচক দিক তুলে ধরে ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগ এবং পরবর্তীতে রাসায়নিক কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের খাদ্যব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে এগ্রোইকোলজির কোনো বিকল্প নেই। এর মাধ্যমেই কেবল টেকসই কৃষি, নিরাপদ খাদ্য এবং খাদ্য সার্বভৌমত্ব অর্জন সম্ভব। একইসঙ্গে আমাদের বন্যজাতের ফসলগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।”

লোকায়ত জ্ঞানের প্রসার নিয়ে কথা বলেন একই বিভাগের প্রফেসর ড. মো. আশরাফুজ্জামান। তিনি বলেন, ধান, সবজি ও মসলা চাষে কৃষকদের যে নিজস্ব লোকায়ত জ্ঞান রয়েছে, বারসিক তা সংগ্রহের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা জরুরি।

সংলাপে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম। তিনি কৃষিতে নারীর মজুরি বৈষম্যের বিষয়টি সামনে এনে বলেন, “পরিবার ও কৃষিতে নারীরা প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ কাজ করলেও এর জন্য তারা কোনো আর্থিক স্বীকৃতি বা শ্রমমজুরি পান না। এগ্রোইকোলজি চর্চা সম্প্রসারিত হলে বীজ সংরক্ষণ, কৃষিকাজ ও পানি সংগ্রহে নারীর কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।”

তিনি আরও বলেন, মানুষের খাদ্য এমন হওয়া উচিত যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিতে এগ্রোইকোলজির নীতিগুলোকে সরকারি বিদ্যমান নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. সুবিবুল হক।

সভাপতির বক্তব্যে বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. মো. নেছার উদ্দিন পুরো আলোচনার সারমর্ম টেনে বলেন, “হাওর ও সমতল অঞ্চলের কৃষির যে সংকট ও বাস্তবতা আজ চিহ্নিত হলো, তা সেকেন্ডারি স্টেকহোল্ডারদের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরতে হবে। জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়তে হলে কৃষি, পরিবেশ এবং নারী ও কৃষকের অধিকারকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।”

বারসিককে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আধুনিক প্রযুক্তির সাথে লোকায়ত জ্ঞানের সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপদ ও জৈব খাদ্য উৎপাদনের যে পথ আজ উন্মোচিত হলো, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিতে হবে।”

সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা এবং জলবায়ুসহনশীল ভবিষ্যৎ গড়তে এই সংলাপ মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন উপস্থিত সবাই।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version