নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি হাসপাতাল মানেই সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল। এই ভরসাস্থলটিই যখন স্রেফ বিনামূল্যে ওষুধ সংগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তখন প্রকৃত ও মুমূর্ষু রোগীদের জীবন কতটা ঝুঁকির মুখে পড়ে-তারই রূঢ় বাস্তবতা উঠে এসেছে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নেত্রকোনা জেলা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আকলিমা আক্তারের বক্তব্যে। রোগীদের অসচেতনতা, ধৈর্যহীনতা এবং সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসকদের নীরব সংগ্রামের এক মানবিক ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নেত্রকোনা জেলা শাখা কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
‘স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চাই সমতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণ’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নাগরিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিদের সাথে এই সভার আয়োজন করে ‘জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরাম, নেত্রকোনা’। অনুষ্ঠানে সহযোগিতায় ছিল স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি (এসইউএস) ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ।
৯০ শতাংশের লক্ষ্য কেবলই ওষুধ, বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত রোগীবহির্বিভাগে (আউটডোর) রোগীদের উপচে পড়া ভিড়ের নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. আকলিমা আক্তার গত রবিবারের একটি অভিজ্ঞতার কথা জানান। সেদিন মহিলা বহির্বিভাগে তিনি একাই ৩৪৮ জন রোগী দেখেছেন।
বিস্ময়কর তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “এই ৩৪৮ জনের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই প্রকৃত রোগী নন; তারা এসেছেন কেবল সরকারি ওষুধ নিতে। অনেকে এসে সরাসরি বলেন- গ্যাসের ওষুধ দেন, ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন দেন। এমনকি অনেকে এমন মানসিকতাও পোষণ করেন, ৫০ টাকা গাড়িভাড়া খরচ করে হাসপাতালে এসেছেন, তাই ওষুধ নিয়ে সেই ভাড়ার টাকাটা পুষিয়ে নিতে হবে। ওষুধ নেওয়ার পর চিকিৎসকের কষ্ট করে লেখা ব্যবস্থাপত্রটি (প্রেসক্রিপশন) তারা রুম থেকে বের হয়েই ছিঁড়ে ফেলে দেন।”
অযাচিত ভিড়ের কারণে প্রকৃত অসুস্থ রোগীরা কীভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন, তা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, একজন উচ্চ রক্তচাপ বা জটিল সমস্যায় আক্রান্ত বয়স্ক রোগীকে যখন মনোযোগ দিয়ে দেখতে ১০ মিনিট সময় দেওয়া হয়, তখন বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ওষুধ প্রত্যাশীরা হট্টগোল ও মারামারি শুরু করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আনসার সদস্যদের হস্তক্ষেপ করতে হয়। ফলে যাদের সত্যিকারের চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রয়োজন, তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া চিকিৎসকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বা ইমারজেন্সির চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ডা. আকলিমা জানান, সকালের বহির্বিভাগের লম্বা লাইন এড়াতে সাধারণ সর্দি, কাশি বা হালকা জ্বরের রোগীরা বিকেলে বা রাতে জরুরি বিভাগে এসে ভিড় জমান।
তিনি বলেন, “জরুরি বিভাগ মানে হলো যেখানে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, রক্তক্ষরণ বা সড়ক দুর্ঘটনার মতো জীবন-মরণ সংকটের রোগীরা আসবেন। দেখা যায়, একজন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মুমূর্ষু রোগী যখন শয্যায় কাতরাচ্ছেন, তখন সর্দি-কাশির রোগীরা সামনে দাঁড়িয়ে পুরো জরুরি বিভাগ ব্লক করে রাখেন। চিকিৎসক যখন জীবন বাঁচাতে ওই মুমূর্ষু রোগীর কাছে ছুটে যান, তখন সাধারণ রোগীরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কেন তাদের আগে দেখা হলো না। আমাদের সমাজে ধৈর্যের বড়ই অভাব।” পূজার সময়ের এক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, মারামারির ঘটনায় আহত হয়ে একসাথে ৫০ জন লোক আসায় পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ফোর্স পর্যন্ত ডাকতে হয়েছিল।
চিকিৎসকদেরও যে রক্ত-মাংসের শরীর এবং তাদেরও ক্লান্তি আসে, তা সাধারণ মানুষ প্রায়ই ভুলে যান। টানা রোস্টার ডিউটি ও হাজারো রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসকদের নাভিশ্বাস ওঠে।
আক্ষেপের সুরে এই নারী চিকিৎসক বলেন, “গতকাল গলাব্যথা ও কাশির কারণে ওয়ার্ড বয়কে এক কাপ চা আনতে বলেছিলাম। রোগীর চাপে সেই চা ঠান্ডা হয়ে বরফ হয়ে গেছে, চুমুক দেওয়ার সময় পাইনি। অথচ আমি যদি ভেতরে গিয়ে পাঁচ মিনিটের জন্য সেই চা খেতে যাই, তবে অনেকেই মোবাইলের ক্যামেরা অন করে ভিডিও করে বলবেন- ডাক্তার দায়িত্ব রেখে ভেতরে বসে নাস্তা করছেন, আরাম করছেন!” তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগ পেলে বা ভিডিও দেখলে সাংবাদিকরা যেন প্রকৃত সত্যটা যাচাই (ভেরিফাই) করেন।
হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই, এর পেছনে সেবাগ্রহীতাদের অসচেতনতা কতটা দায়ী, তার একটি বাস্তব উদাহরণ দেন ডা. আকলিমা। হাসপাতালের নতুন ভবনের পাঁচতলায় গাইনি ইনডোরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাথরুমের পাশেই ময়লা ফেলার নির্ধারিত বিন (ডাস্টবিন) থাকা সত্ত্বেও রোগীর স্বজনরা ব্যবহৃত স্যানিটারি প্যাড বারান্দা দিয়ে নিচে ছুড়ে ফেলেন- যা নিচে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মাথার ওপর গিয়ে পড়ে। এছাড়া কমোডের ভেতরে প্যাড ফেলে দেওয়ায় প্রায়ই বাথরুম ব্লক হয়ে নোংরা পানি উপচে পড়ে এবং দ্রুত দুর্গন্ধ ছড়ায়।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, “আমাদের স্টাফ সংখ্যা এমনিতেই কম। এখন কে কোথায় ময়লা ফেলছে, তা পাহারা দেওয়ার জন্যও কি ওয়ার্ড বয় দাঁড় করিয়ে রাখা সম্ভব? বাড়ির টয়লেট আমরা যেভাবে পরিষ্কার রাখি, হাসপাতালের টয়লেট ব্যবহারে সেই ন্যূনতম সচেতনতাটুকু কেউ দেখান না।”
২৫০ শয্যার হাসপাতালে শয্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা সবসময়ই বেশি থাকে। বিএসএমএমইউ (পিজি হাসপাতাল)-এর মতো বিশেষায়িত হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকলে রোগী ভর্তি নেওয়া না হলেও, জেলা সদর হাসপাতালে মানবিক কারণে কোনো প্রসূতি মাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না; মেঝেতে (ফ্লোরে) রেখেও সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে সুস্থ করে বাড়ি পাঠানো হয়। তবে একজন রোগীর সাথে চার-পাঁচ জন স্বজন এসে ভিড় করায় পরিবেশ নষ্ট হয়।
সিজারিয়ান সেকশন (অস্ত্রোপচার) নিয়ে সাধারণের ভুল ধারণা ভেঙে দিয়ে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট কারণ (ইন্ডিকেশন) ছাড়া আমরা সিজার করি না। প্রথম সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে বাচ্চা ও মায়ের অবস্থা ভালো থাকলে নরমাল ডেলিভারির জন্য আমরা ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করি। প্রসবব্যথা (লেবার পেইন) শুরু হলেই রোগীর স্বজনরা অস্থির হয়ে ওঠেন এবং দ্রুত সিজার করার জন্য নানা মাধ্যমে তদবির ও ফোনের পর ফোন করতে থাকেন। আবার সিজার করলে বাইরে গিয়ে বদনাম হয় ডাক্তাররা গেলেই পেট কেটে ফেলেন।”
এছাড়া ২০২৬ সালে এসেও গর্ভবতী মায়েদের অসচেতনতা ও কুসংস্কার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে গর্ভবতী মায়েদের বিনামূল্যে এক মাসের আয়রন ও ক্যালসিয়াম ওষুধ দেওয়া হলেও, ‘আয়রন খেলে পেটের বাচ্চা বড় হয়ে যাবে’- এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকে অনেক মা তা খান না। ফলে ৩৪-৩৫ সপ্তাহের গর্ভবতী মা যখন প্রসবের জন্য আসেন, তখন তার শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা থাকে মাত্র পাঁচ বা ছয়, যা মা ও শিশুর জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং এ সময় রক্ত জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরা কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং হাসপাতালে নির্ধারিত সময়ের বাইরেও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের (রিপ্রেজেন্টেটিভ) অবাধ বিচরণের বিষয়টি তুলে ধরেন। জবাবে ডা. আকলিমা আক্তার জানান, মাত্র এক মাস আগে (গত ১৯ সেপ্টেম্বর) তিনি বারহাট্টা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বদলি হয়ে সদর হাসপাতালে যোগদান করেছেন। প্যাথলজি বিভাগে জনবল সংকটের কারণে ইনডোর ও আউটডোরের বিপুল সংখ্যক রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তবে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের নির্ধারিত সময়ের (সোম ও বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে ১টা) বাইরে ভিড় করা, ডেঙ্গু ওয়ার্ড, ড্রাগ লিস্ট এবং বহির্বিভাগের সমস্যাগুলো হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন এই চিকিৎসক।
চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যকার আস্থার সংকট দূর করতে এবং সদর হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে কেবল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর দায় চাপালেই চলবে না; বরং সাধারণ মানুষের ধৈর্য, পরিচ্ছন্নতা বোধ এবং সচেতনতাই পারে সুন্দর ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশ নিশ্চিত করতে- মতবিনিময় সভায় এমনটাই প্রতীয়মান হয়েছে।


