নিজস্ব প্রতিবেদক: দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া এলাকা। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত তখন আনুমানিক ৮টা। চারপাশের কোলাহল কিছুটা কমে এসেছে। এমন স্বাভাবিক আর শান্ত পরিবেশেই হঠাৎ পরপর কয়েকটি গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এক কলমযোদ্ধার কণ্ঠ। দুর্বৃত্তদের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারালেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির, যিনি সর্বমহলে ‘আলিফ ফকির’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।
সংবাদ সংগ্রহের নেশায় যিনি ছুটে বেড়াতেন শহর থেকে সীমান্তে, সেই আলিফ ফকিরের নিথর দেহ এখন পড়ে আছে হাসপাতালের মর্গে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শুধু একটি প্রাণেরই অবসান ঘটেনি, বরং স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে সীমান্ত চোরাচালানসহ স্থানীয় অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলা এক সাহসী কণ্ঠস্বরকে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় চায়ের দোকানি রবিন রাংসা (মতান্তরে সাংমা) জানান, প্রতিদিনের মতোই তার দোকানে স্বাভাবিক বেচাকেনা চলছিল। ঘটনার কিছুক্ষণ আগে আলিফ ফকির তার মুঠোফোনটি রবিনের দোকানে রেখে যান। রাত ৮টার দিকে সেই ফোনটি নিতেই আবার ফিরে আসেন তিনি।
ঠিক সেই সময়েই দোকানে আসে ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অপরিচিত দুই যুবক। তারা দোকান থেকে সিগারেট কেনে। আলিফ তার ফোনটি নিয়ে দোকান থেকে বের হতেই ওই দুই যুবক তার পিছু নেয়। রবিন বলেন, “তারা পিছু নেওয়ার পরপরই আমি তিনটি গুলির বিকট শব্দ শুনতে পাই। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ভয়ে আমি আর বাইরে বের হইনি, সোজা বাড়ির ভেতরে চলে যাই।”
স্থানীয়রা জানান, গুলির শব্দ শুনে তারা ছুটে এসে দেখেন আলিফ ফকির রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে আছেন। আর ঘাতকরা ততক্ষণে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। ঘটনাস্থলে কয়েকটি গুলির খোসা পড়ে থাকতে দেখা যায়।
খবর পেয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় গুলিবিদ্ধ আলিফকে দ্রুত উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।
নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামে। তার বাবার নাম মহব্বত আলী ফকির। তবে পেশাগত ও ব্যক্তিগত কারণে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তিনি দুর্গাপুর পৌরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ডের তেলুঞ্জিয়া এলাকাতেই বসবাস করতেন।
পেশাগত জীবনে আলিফ ফকির ‘রূপসী বাংলা’ আইপি টেলিভিশনের নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছিলেন দারুণ সরব। ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে তার ফেসবুক পেজ ছিল। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এই পেজের মাধ্যমেই তিনি মূলত নিজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছিলেন। সীমান্ত চোরাচালান, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে স্থানীয় নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিও ও তথ্য তিনি নিয়মিত তার পেজে প্রকাশ করতেন।
সত্য তুলে ধরার সাহসিকতার মূল্য এর আগেও তাকে চোকাতে হয়েছে। অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করতে গিয়ে তিনি একাধিকবার দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছিলেন, আহতও হয়েছিলেন। কিন্তু তবু তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, সেই পেশাগত শত্রুতার জেরেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
ঘটনার সময় বাসাতেই ছিলেন আলিফ ফকিরের স্ত্রী আনন্দিতা সরকার। হঠাৎ খবর পান তার স্বামীকে গুলি করা হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ ভেঙে পড়ে তার মাথায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “খবর পেয়েই আমি পাগলের মতো ছুটে যাই সেখানে। গিয়ে দেখি আমার স্বামী মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।” স্থানীয়দের সাহায্য নিয়ে তিনি নিজেই স্বামীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, শেষ আশা ছিল হয়তো মানুষটা বেঁচে ফিরবে। সেই আশা আর পূরণ হয়নি। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা।
এ বিষয়ে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ জানান, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত পাঁচটি গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করছে।
এদিকে সাংবাদিক নিহতের খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তরিকুল ইসলাম। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ঘাতকদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে ইতোমধ্যে পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
একজন গণমাধ্যমকর্মীকে এভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দুর্গাপুরসহ পুরো নেত্রকোনায় গভীর শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।




