নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের আলো ফুটতেই যারা পরম মমতায় বীজতলায় হাত রাখেন, পরিবারের জন্য নিরাপদ খাদ্যের জোগান দিতে যারা উঠোনে বিষমুক্ত সবজি ফলান- যুগ যুগ ধরে সেই গ্রামীণ নারীরাই আমাদের কৃষি ও প্রাণপ্রকৃতির নীরব পাহারাদার। অথচ ইতিহাসে তাদের ঘাম ও প্রজ্ঞার স্বীকৃতি বরাবরই থেকে গেছে আড়ালে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নেত্রকোনার কুতুবপুর গ্রামে রচিত হলো অন্যরকম এক চিত্র। স্বীকৃতি, সম্মান আর উদযাপনের মধ্য দিয়ে সেখানে আলোকিত হয়ে উঠলেন ২৫ জন প্রান্তিক নারী, যারা কেবল সংসারই সামলান না, বাঁচিয়ে রেখেছেন আমাদের আদি কৃষি ও প্রতিবেশকে।
আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামে মাসুদ মিয়ার ‘এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারে’ বসেছিল প্রাণের মেলা। “গ্রামীণ নারীর উত্থান: বেইজিং +৩০ এর মাধ্যমে সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ”- সময়োপযোগী এই প্রতিপাদ্যকে বুকে ধারণ করে অনুষ্ঠিত হয় ‘গ্রামীণ নারী সম্মাননা প্রদান ২০২৬’।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক’ এবং নেত্রকোনা জেলা ‘গ্রিন কোয়ালিশন কমিটি’র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ব্যতিক্রমী আয়োজনটি গতানুগতিক কোনো সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল শেকড়সন্ধানী নারীদের এক মিলনমেলায়।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল সম্মাননা প্রদান। কৃষিতে কেবল ফলন নয়, বরং প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখার মতো ১৫টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ২৫ জনকে সম্মাননা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল- এগ্রোইকোলজি চর্চা, প্রাণবৈচিত্র্য ও বীজ সংরক্ষণ, খাদ্য সার্বভৌমত্ব, টেকসই ও বিষমুক্ত কৃষি, জলবায়ু-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, কমিউনিটি বীজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, জৈব বালাই দমন, বৃক্ষরোপণ, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পাখি ও প্রাচীন গাছ সংরক্ষণসহ আরও বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ।
সম্মাননাপ্রাপ্ত ২৫ জন নারী হলেন- কাজলা আকতার, মমতা আকতার, জান্নাতুল, অঞ্জনা রাণী কর্মকার, পারভীন আকতার, মর্জিনা বেগম, প্রিয়া আকতার, হোসনা আকতার, জহুরা আকতার, আম্বিয়া বেগম, মদিন আকতার, কল্পনা, ফাতেমা, স্বপ্না, রুপতারা, মোসা. রহিমা, রহিমা, কবিতা, আছিয়া, মোছা: নাসরিন আকতার, সনি রাণী দাস, হাওয়া আকতার, কামরুন্নাহার লিপি এবং ইকরা জাহান। নারীত্বের উদযাপনে সমাজের অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি শাহনাজ পারভীন রুপালিও এই সম্মাননা অর্জন করেন।
অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণটি পরিণত হয়েছিল মিনি জাদুঘরে। স্থানীয় নারীদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আয়োজিত মেলাটি যেন ছিল গ্রামীণ জ্ঞান ও চর্চার এক জীবন্ত ক্যানভাস। শত শত নারী-পুরুষ ও যুবকের পদচারণায় মুখরিত মেলা প্রাঙ্গণের স্টলগুলোতে থরে থরে সাজানো ছিল বিলুপ্তপ্রায় স্থানীয় বীজ, অচাষকৃত খাদ্য, নিরাপদ শাকসবজি, কুটিরশিল্প ও দেশীয় ফল। একইসাথে সেখানে প্রদর্শিত হয় জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার, রাসায়নিক কৃষির ক্ষতিকর দিক নিয়ে সচেতনতামূলক চিত্র এবং হাওরাঞ্চলের নারীদের জলবায়ু অভিযোজনের নিজস্ব কৌশল। গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা স্বাদের পিঠার ম-ম গন্ধে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা গ্রিন কোয়ালিশন কমিটির সহ-সভাপতি আলপনা বেগম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সম্মাননা তুলে দেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান।
নিজের বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ঐতিহাসিক সত্যকে সামনে এনে বলেন, “যুগে যুগে গ্রামীণ নারীর হাত ধরেই কৃষি, পরিবেশ ও জীবনযাপনের বৈচিত্র্যময় সম্পর্কগুলো গড়ে উঠেছে। প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় নারীদের ভূমিকা অপরিসীম হলেও তারা যথাযথ স্বীকৃতি পাননি। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ঘোর সংকটে গ্রামীণ নারীদের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি প্রান্তিক নারীদের তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আনা এবং তাদের প্রতি সকল প্রকার পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা শূন্যে নামিয়ে আনার ওপর জোর দেন।
নারীদের অধিকার নিয়ে অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রাখেন বিশেষ অতিথি কাইলাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুল হক। সমাজের রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে জীবন বাজি রেখে পরিবার ও গবাদিপশু রক্ষার দায়িত্ব নারী নিলেও নীতি নির্ধারণে তাঁদের মতামতের কোনো দাম দেওয়া হয় না। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের কারণে মাটি-পানি দূষিত হয়ে গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তিনি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, “কৃষিকাজে জড়িত সকল গ্রামীণ নারীকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সরকারি প্রণোদনা ও কৃষি কার্ড সরাসরি নারীর নামে বরাদ্দ করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফারজানা সুলতানা, মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফাহমিদা সুলতানা এবং এলাকার বিশিষ্ট সাংবাদিক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
উপস্থিত আলোচক ও বোদ্ধাদের অভিন্ন মত ছিল- নারীরা যখন কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা বা এগ্রোইকোলজির অনুশীলন করেন, তখন কেবল পরিবেশেরই সুরক্ষা হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্বও নিশ্চিত হয়। নেত্রকোনার ২৫ নারীর স্বীকৃতি কেবল সম্মাননা স্মারক নয়, বরং এটি টেকসই আগামীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিশালী বার্তা, যেখানে নারীই পথপ্রদর্শক।




