নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রতিদিনের মতোই উপার্জনের আশায় নিজের ব্যাটারি চালিত তিন চাকার বাহন মিশুক গাড়িটি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন রুকন উদ্দিন। পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষায় ছিলেন, দিন শেষে হয়তো ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরবেন মানুষটি। সেই অপেক্ষা যে এমন ভয়ংকর বিষাদে রূপ নেবে, তা কে জানত! নিখোঁজের একদিন পর জঙ্গল থেকে উদ্ধার হলো তার হাত-পা বাঁধা ও মুখ আটকানো নিথর দেহ।
নিহত রুকন উদ্দিন (৪০) সদর উপজেলার লক্ষ্মীগঞ্জ ইউনিয়নের গিডুরপাড়া গ্রামের মৃত হোসেন আলীর ছেলে। পেশায় তিনি একজন মিশুকচালক ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গতকাল বুধবার দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে জীবিকার তাগিদে বাড়ি থেকে বের হন রুকন। এরপর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা এবং রাত নামলেও তিনি আর নিজ আঙিনায় ফিরে আসেননি। সম্ভাব্য সকল আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত স্থানে দিনভর খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি উদ্বিগ্ন পরিবার।
অবশেষে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে বুকভরা শঙ্কা রূপ নেয় নির্মম বাস্তবে। সদর উপজেলার সিংহের বাংলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকার ‘বুদিয়ার জঙ্গল’-এ একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। খবর পেয়ে স্বজনেরা ছুটে যান সেই জঙ্গলে। সেখানে পড়ে থাকা নিথর দেহটি দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা, শনাক্ত করেন এটি তাদেরই হারানো স্বজন রুকন উদ্দিনের মরদেহ।
মরদেহটি উদ্ধারের সময়কার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ঘাতকেরা চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে। রুকন উদ্দিনের মুখমণ্ডল ও দুই পা সাদা রঙের মোটা স্কচটেপ দিয়ে শক্তভাবে প্যাঁচানো ছিল। আর তাঁর দুই হাত পিঠের দিকে নিয়ে একটি গামছা দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি সুপরিকল্পিত ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। দুর্বৃত্তরা নির্দয়ভাবে তাকে হত্যার পর নির্জন জঙ্গলে মরদেহটি ফেলে রেখে গেছে।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় নেত্রকোনা সদর মডেল থানা পুলিশ। তারা সুরতহাল শেষে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছে।
ঘটনার বিবরণ জানিয়ে নেত্রকোনা সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল খায়ের বলেন, “মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি হত্যাকাণ্ড বলেই মনে হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও সময় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
ওসি আরও জানান, এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ শুরু করেছে। নিহতের শোকাহত পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে থানায় অবস্থান করছেন। এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের না হলেও, পুলিশের পরবর্তী আইনি কার্যক্রম ও তদন্ত পুরোদমে চলমান রয়েছে।
একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে গোটা গিডুরপাড়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রুকনের অকাল ও অস্বাভাবিক মৃত্যু কেবল পরিবারকেই পথে বসায়নি, বরং সাধারণ মানুষের মনে গভীর বেদনার জন্ম দিয়েছে। পরিবারের এখন একটাই চাওয়া- দ্রুততম সময়ে তদন্তের মাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।




