কেন্দুয়া প্রতিনিধি: মাত্র এক সপ্তাহ আগেই বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরব থেকে নিজ গ্রামে ফিরেছিলেন ২০ বছর বয়সী তরুণ আবির হোসেন। দীর্ঘদিন পর আপনজনদের কাছে পেয়ে হয়তো ভেবেছিলেন কিছুদিন শান্তিতে কাটাবেন। কিন্তু বাড়ির সীমানার এক টুকরো মাটি তার সব স্বপ্নকে চিরতরে কবর দিয়ে দিল। আপন চাচাতো চাচার দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারাতে হলো এই তরুণকে। একই হামলায় গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তার বাবা এনামুল হক (৪৫)।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইল বাড়ি ইউনিয়নের পুরানবাড়ি গ্রামে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে ঘটেছে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা। জমিজমা বা বাড়ির সীমানা নিয়ে আত্মীয়দের মধ্যে বিরোধ আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়, কিন্তু তা যে এমন রক্তক্ষয়ী রূপ নিতে পারে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি এনামুলের পরিবার।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বাড়ির সীমানা নিয়ে এনামুল হকের সঙ্গে তার আপন চাচাতো ভাই বকুল মিয়ার বিরোধ চলছিল। মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে এই বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। আকস্মিকভাবে বকুল মিয়া ও তার লোকজন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এনামুল হকের বাড়িতে অতর্কিতে হামলা চালায়।
হামলাকারীদের উন্মত্ততায় মুহূর্তের মধ্যেই রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এনামুল ও তার সদ্য বিদেশফেরত ছেলে আবির। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যান স্থানীয়রা। পরে প্রতিবেশীরা দ্রুত এগিয়ে এসে রক্তাক্ত বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করে প্রথমে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তাদের শরীরে আঘাতের মাত্রা এতটাই গুরুতর ছিল যে, সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন।
মমেক হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েও বাঁচাতে পারেননি আবিরকে। ওইদিন মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই তরুণ। স্বজনদের গগনবিদারী আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। অন্যদিকে, ছেলের মৃত্যুর খবর অজানা রেখেই হাসপাতালের বিছানায় সংকটাপন্ন অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন বাবা এনামুল হক। স্বজনরা জানিয়েছেন, তার অবস্থাও বেশ আশঙ্কাজনক।
এ বিষয়ে কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনার পর থেকে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকার পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে এবং এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
এক টুকরো জমির জন্য আপন রক্তের সম্পর্ক কীভাবে এমন নিষ্ঠুরতায় রূপ নিতে পারে, তা ভেবে বাকরুদ্ধ পুরো এলাকাবাসী। আবিরের অকাল মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নই ভেঙে দেয়নি, বরং সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সম্পদের মোহ কীভাবে মানুষের মানবিকতাকে গ্রাস করছে। প্রবাস থেকে ফেরা যে ছেলেটির পরিবারের হাল ধরার কথা ছিল, আজ সেই ছেলেটিরই নিথর দেহ পড়ে আছে মর্গে। একখণ্ড জমির সীমানা হয়তো নির্ধারিত হবে, আবিরের শূন্যস্থান পরিবারে আর কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।




