মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩

রুহুল আমিন,ডিমলা(নীলফামারী)

একটু অসতর্ক হলেই পা পিছলে পড়তে হবে নদীতে। কোথাও পাটাতনের তক্তা বেঁকে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে ফাঁক ও গর্ত। দুই পাশে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী। তবু এই নড়বড়ে কাঠের সাঁকো পেরিয়েই প্রতিদিন স্কুল-মাদ্রাসায় যায় শিক্ষার্থীরা, হাটে কৃষিপণ্য নিয়ে যান কৃষকেরা, আর জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করেন অসুস্থ রোগীসহ নানা বয়সী মানুষ। কারণ, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা নদীর ওপর স্থায়ী সেতু নেই। ফলে বিকল্প পথের অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে তিন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।

নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু—এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু সেই দাবি এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। স্থানীয় উদ্যোগে নির্মিত কাঠের সাঁকোটিই নাউতারা, গয়াবাড়ী ও খালিশা চাপানী ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। দীর্ঘদিন ব্যবহারে সেটিও এখন নড়বড়ে। সেতুর অভাবে একদিকে যেমন প্রতিদিনের চলাচলে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গাছবাড়ি এলাকায় নাউতারা নদীর ওপর সাঁকোটির অবস্থান। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে এর পাটাতনের তক্তা বেঁকে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ফাঁক ও গর্ত তৈরি হয়েছে। দুই পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় সাঁকোটি দিয়ে চলাচলের সময় ভারসাম্য হারিয়ে নদীতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য পারাপার আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এই পথ দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে যাতায়াত করেন। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বাড়লে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। জরুরি প্রয়োজনে রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া কিংবা নিত্যপ্রয়োজনে হাটবাজারে যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। স্থায়ী সেতু না থাকায় নিরাপদ যোগাযোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তিন ইউনিয়নের মানুষ।

সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় অভিভাবকেরা
সাঁকোটি দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে থাকেন শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা। ঐতিহ্যবাহী ছোটখাতা কামিল মাদ্রাসাসহ একাধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই পথ ব্যবহার করতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ পাটাতন আর দুই পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় প্রতিদিন সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় অভিভাবকদের।

তাঁদের আশঙ্কা, পারাপারের সময় কোনো শিক্ষার্থী ভারসাম্য হারিয়ে নদীতে পড়ে গেলে দ্রুত উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সাঁকোটির পরিবর্তে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিক রহমান বলেন, “নাউতারা নদীর ওপর সেতু না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। সাঁকোটির অবস্থা ভালো নয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে পারাপারের ভয় আরও বেড়ে যায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছি।”

স্থানীয় বাসিন্দা হযরত আলী বলেন, “শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অসুস্থ রোগী, সবাইকে এই সাঁকো দিয়ে নদী পার হতে হয়। সন্তানদের স্কুল-মাদ্রাসায় পাঠিয়ে অভিভাবকেরা দুশ্চিন্তায় থাকেন। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই এখানে সেতু নির্মাণ করা জরুরি।”
সেতু না থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহনেও ভোগান্তি
নদীর ওপর স্থায়ী সেতু না থাকায় শুধু শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ পথচারীরাই নন, ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষকেরাও। তিন ইউনিয়নের অনেক কৃষক ধান, ভুট্টা, পাট ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য গাছবাড়ি, নাউতারা হাট, নতুন বাজার ও শুটিবাড়ি হাটে নিয়ে যেতে এই পথ ব্যবহার করেন।

কিন্তু জরাজীর্ণ সাঁকো দিয়ে কৃষিপণ্য পরিবহন করতে গিয়ে তাঁদের বাড়তি সময় ও খরচের মুখে পড়তে হয়। ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পারাপার করতে হয়, ব্যাহত হয় স্বাভাবিক যাতায়াতও। এতে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে ভোগান্তি বাড়ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

বাসিন্দা লীটন আহমেদ বলেন, “এই পথে তিন ইউনিয়নের মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে চলাচল করেন। কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজেও সাঁকোটি ব্যবহার করতে হয়। স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে, যোগাযোগব্যবস্থাও সহজ হবে।”

স্থানীয় উদ্যোগে নির্মিত সাঁকোটি দীর্ঘদিন ধরে তিন ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে সময়ের সঙ্গে এর কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়ায় এখন নিরাপদ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

নাউতারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আশিক ইমতিয়াজ মোর্শেদ বলেন, “এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আঞ্চলিক যোগাযোগপথ। আমার উদ্যোগে নির্মিত সাঁকোটি এখন প্রায় অচল। এখানে বহু আগেই একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হওয়া উচিত ছিল।”

উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান বলেন, “স্থানটি পরিদর্শন করেছি। এখানে জরুরি ভিত্তিতে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ প্রয়োজন। বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “সেতুটির গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা চলছে।”

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে স্থায়ী সেতুর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এলেও নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার করতে হচ্ছে তাঁদের।

এলাকাবাসীর কাছে সেতুটি কেবল নদী পার হওয়ার অবকাঠামো নয়; এটি সন্তানদের নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা পাওয়া, কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নেওয়া এবং তিন ইউনিয়নের মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের প্রত্যাশা, বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে।

স্থানীয়দের দাবি, নাউতারা নদীর ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে, নিরাপদ হবে মানুষের চলাচল। এখন তাঁদের অপেক্ষা—দাবি ও আশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে কবে বাস্তবে শুরু হবে সেতু নির্মাণের কাজ।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version