শুক্রবার, অক্টোবর ২

রুহুল আমিন,ডিমলা(নীলফামারী)

সেলাই মেশিনের শব্দে মুখর ছোট্ট ঘরটি। এক পাশে কাপড় কাটছেন একজন, অন্য পাশে ব্যস্ত হাতে সেলাই করছেন কয়েকজন। কেউ আবার তৈরি পণ্য গুছিয়ে রাখছেন কুরিয়ারে পাঠানোর জন্য। তিন বছর আগেও এমন দৃশ্য ছিল না এখানে। তখন ছিল পুরোনো একটি টিনের ঘর, দুটি অকেজো সেলাই মেশিন আর মাত্র দুজন কর্মী। হাতে ছিল ১০ হাজার টাকা।

সেই সামান্য পুঁজি নিয়েই শুরু করেছিলেন ডিমলার তরুণ উদ্যোক্তা ফজিদুল ইসলাম। এখন তাঁর প্রতিষ্ঠানে ৩১টি সেলাই মেশিন। কাজ করছেন ২৫ জন অপারেটর ও সাতজন কর্মচারী। মাসে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ডেকোরেশন সামগ্রী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে অর্ডার। পণ্য যাচ্ছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত।

তবে এই গল্প শুধু একটি ছোট ব্যবসা বড় হয়ে ওঠার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের গল্প।

ফজিদুলের প্রয়াত বাবা মাইক জহুরুল ইসলাম স্বপ্ন দেখতেন, উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী ডিমলায় একটি মাল্টিমিডিয়া ডিজাইন সেন্টার গড়ে তুলবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। বাবার মুখে বারবার শোনা সেই স্বপ্ন ছেলের মনে জায়গা করে নেয়। বাবার মৃত্যুর এক বছর পর, ২০২৩ সালের ২৫ জুলাই, মাত্র ১০ হাজার টাকা নিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে হাঁটেন ফজিদুল।

ডিমলা সদর ইউনিয়নের ডিমলা আর বি আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণে হাইস্কুলপাড়া এলাকায় পৈতৃক জায়গায় গড়ে ওঠে ফারিহা ডিজাইন সেন্টার। শুরুতে দুটি পুরোনো ও অকেজো সেলাই মেশিন কিনে মেরামত করেন তিনি। শহিদুল ইসলামের পরামর্শ ও উৎসাহে দুজন অপারেটর নিয়ে শুরু হয় ডেকোরেশন সামগ্রী তৈরির কাজ।

শুরুটা ছিল ছোট। কিন্তু অর্ডার আসতে থাকায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কাজের পরিধি। ব্যবসা সম্প্রসারণে পরে দুটি বেসরকারি এনজিও থেকে মোট ১৪ লাখ টাকা ঋণ নেন ফজিদুল। মাসিক কিস্তিতে সেই ঋণ পরিশোধ করছেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, পৈতৃক জায়গায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির ছোট পরিসর এখন আর আগের মতো নেই। সারি সারি সেলাই মেশিনে চলছে কাজ। কেউ কাপড় কাটছেন, কেউ ক্রেতার দেওয়া নকশা অনুযায়ী সেলাই করছেন। তৈরি পণ্য এক জায়গায় জমা করে রাখা হচ্ছে। এরপর সেগুলো যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতার কাছে।

ফজিদুলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রতিষ্ঠানে মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ডেকোরেশন সামগ্রী উৎপাদন হয়। উৎপাদিত পণ্যের প্রায় পুরোটাই একই মাসে বিক্রি হয়ে যায়। কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, ঋণের কিস্তিসহ বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে মাস শেষে নিট লাভ থাকে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
ডিমলায় বসে দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইন বড় ভূমিকা রাখছে। ‘FARIHA DESIGN CENTER’ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্যের প্রচার করা হয়। ‘ফারিহা ডিজাইন সেন্টার ডিমলা’ নামে ইউটিউব চ্যানেলেও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তুলে ধরা হচ্ছে। অনলাইনে অর্ডার নেওয়ার পর ক্রেতার চাহিদা ও নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে কুরিয়ারে পাঠানো হয়।

ফজিদুল ইসলাম বলেন, “বাবার স্বপ্ন ছিল ডিমলায় একটি ডিজাইন সেন্টার গড়ে তোলা। তিনি সেটি করে যেতে পারেননি। বাবার সেই স্বপ্নই আমি নিজের স্বপ্ন হিসেবে নিয়েছি। অল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই।”

তাঁর ভাষ্য, ব্যবসা আরও বড় করতে প্রয়োজন মূলধন। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা পেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আরও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “স্থানীয় তরুণদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। ফজিদুল ইসলামের মতো উদ্যোক্তারা নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের কাজের সুযোগ তৈরি করছেন। এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় উদ্যোক্তাদের সহায়তার সুযোগ থাকলে নিয়ম অনুযায়ী তা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।”

১০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন ৩১টি সেলাই মেশিনের একটি কর্মচঞ্চল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সেখানে কাজ করছেন ৩২ জন। বাবার দেখা স্বপ্নটি হয়তো ঠিক সেই রূপে হয়নি, তবে ফজিদুলের হাত ধরে ডিমলার মাটিতে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের একটি নতুন ঠিকানা। আর সেই ঠিকানার গল্প শুরু হয়েছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা আর দুটি অকেজো সেলাই মেশিন দিয়ে।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version