নিজস্ব প্রতিবেদক: “বন নাই তো নদী নাই, নদী নাই তো পানি নাই, পানি নাই তো জীবন নাই”- কেবল একটি শ্লোগান নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক চরম সত্যকে বুকে ধারণ করে নেত্রকোনায় পালিত হলো বিশ্ব নদী দিবস। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) নেত্রকোনা কালেক্টরেট স্কুল মাঠে নদী, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় তরুণ প্রজন্মের ভিন্নধর্মী ও মননশীল উদ্যোগের সাক্ষী হলো স্থানীয়রা। আয়োজনের মূল আকর্ষণ ছিল ‘নদী কথা ও আমাদের মৌন ব্রত’ শীর্ষক ব্যতিক্রমী কর্মসূচি, যেখানে নদীর প্রতি অবিচার ও প্রকৃতির নীরব কান্নার প্রতিবাদ জানানো হয় নিস্তব্ধতার ভাষায়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক, গ্রিন কোয়ালিশন কমিটি এবং নেত্রকোনা সম্মিলিত যুব সমাজের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী ও যুব সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
আয়োজনের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও আবেগময় পর্বটি ছিল ‘নদীবন্ধন’। পৌরশহরে কালেক্টরেট স্কুল মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা শতাধিক শিক্ষার্থীর হাতে ছিল নেত্রকোনার বিভিন্ন প্রান্তের প্রবহমান ও বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী নদীগুলোর নাম লেখা প্ল্যাকার্ড। কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া নদীগুলোর নাম যখন তরুণদের হাতে সসম্মানে শোভা পাচ্ছিল, তখন পুরো প্রাঙ্গণে তৈরি হয় অদ্ভুত এক শিহরণ।
এরপরই শুরু হয় ‘মৌন ব্রত’। নদী দখল, দূষণ ও ধ্বংসের প্রতিবাদ এবং প্রকৃতির বোবা আর্তনাদকে অনুভব করতে অংশগ্রহণকারীরা নীরবতা পালন করেন। কোনো স্লোগান বা কোলাহল ছাড়াই কেবল নীরবতার মধ্য দিয়ে তারা বুঝিয়ে দেন পরিবেশের প্রতি মানুষের অবিচারের গভীরতা।
মৌন ব্রতের পাশাপাশি আয়োজন করা হয় নদী, জল, বন ও পরিবেশের পারস্পরিক নির্ভরতা নিয়ে গভীর আলোচনা সভা এবং বিষয়ভিত্তিক রচনা প্রতিযোগিতা। সকালে ১১টায় নেত্রকোনা সম্মিলিত যুব সমাজের আহ্বায়ক পার্থ প্রতীম সরকারের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় শুরু হয় আলোচনা পর্ব।
বক্তারা অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেন যে- বন, নদী, পানি ও মানবজীবন একই সুতোয় গাঁথা; এটি মূলত একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম। নদী যদি তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারায়, তবে কেবল পরিবেশ নয়, মানুষের অস্তিত্বও চরম সংকটে পড়বে। “আমাদের নদী, আমাদেরই জীবন”- প্রকৃতি ও মানুষের এই অচ্ছেদ্য নির্ভরশীলতার কথা বারবার ধ্বনিত হয় তাদের কণ্ঠে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বারসিকের আঞ্চলিক প্রতিনিধি অহিদুর রহমান। তারা তাদের বক্তব্যে তরুণ সমাজকে পরিবেশ রক্ষায় আরও বেশি সোচ্চার ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য এই আয়োজনের শেষভাগে সচেতনতামূলক রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী এবং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। তবে এটি কেবল পুরস্কার ছিল না, ছিল পরিবেশ রক্ষার এক অদৃশ্য দায়িত্বের হস্তান্তর।
তরুণদের প্রাণবন্ত, সুশৃঙ্খল ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ স্থানীয় সুশীল সমাজ ও উপস্থিত সাধারণ মানুষের কাছে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছে। উপস্থিত অনেকেই মত প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি নদীর প্রতি এমন গভীর মমতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে আসে, তবে হয়তো বাংলার বুক চিরে আবারও সগৌরবে বয়ে চলবে মৃতপ্রায় নদীগুলো।


