শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫

প্রতিটি দেশ নিয়ে গঠিত বিশ্বের একমাত্র সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান ‘জাতিসংঘ’। এই প্রতিষ্ঠানের মূল নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকারী এর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি জাতিসংঘের প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালিত হয় মহাসচিবের নেতৃত্বে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্র পাঁচটি—চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। এই দেশগুলোর রয়েছে ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা। এছাড়া প্রতি বছর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনসাপেক্ষে ১০টি দেশ অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়।

অন্যদিকে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে গঠিত ‘সাধারণ পরিষদ’ যেন পুরো বিশ্বের একান্নবর্তী পরিবার। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের বাজেট অনুমোদন, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচন।

আমাদের সমাজে যেমন ধর্মীয় উৎসব বা পারিবারিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সবাই নিজ নিজ ঠিকানায় একত্রিত হয়, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনও অনেকটা সেরকম সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে। এ উপলক্ষে নির্দিষ্ট কাজের সমাধান হয়, প্রতিনিধিরা একে অপরের সান্নিধ্য পান এবং জটিল আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের পথ বা সূত্র তৈরি হয়। একইভাবে এই অধিবেশনে সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা পরস্পরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন, যা পরে বাস্তবে প্রতিফলিত হয়।

এর এক চমৎকার ও কালজয়ী উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম— ১৯৮০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৩৫তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে। আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে জাতিসংঘের ৩৫তম অধিবেশনে এই ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ক তার বক্তব্যে যে অঙ্গীকার ও রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন, তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে তা বাস্তবায়ন করেছেন। যেসব বিষয়ে তিনি দৃষ্টিপাত করেছিলেন, তার বহিঃপ্রকাশ পরে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে।

১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮০ সালে (বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে) দেওয়া তার প্রথম ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আধুনিক স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বমঞ্চে এক ঐতিহাসিক বার্তা দেন। ভাষণের শুরুতেই তিনি বাংলাদেশের স্বনির্ভর উন্নয়ন সংগ্রামের বিবরণ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আকুল আহ্বান জানান।

তিনি বাংলাদেশের তৎকালীন মূল চ্যালেঞ্জ—যেমন জনসংখ্যার চাপ, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা ও নিম্ন মাথাপিছু আয়ের চিত্র তুলে ধরেন। পাশাপাশি কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশে বাস করে। এখানকার জনসংখ্যার ঘনত্ব জাপান ও নেদারল্যান্ডসের চেয়েও দ্বিগুণ। অর্ধেকের বেশি মানুষ বেকার অথবা ভূমিহীন কৃষক, যাদের বড় অংশই কেবল মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২০ লাখ মানুষের খাদ্যসংস্থান করতে হয়। এত কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ যে থমকে যাবে না, সে কথা জানিয়ে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাইনি এবং কখনোই হবো না।’

পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন তিনি। ১৯৮৫ সালের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং নতুন বিদ্যালয় ও হাসপাতাল স্থাপনের লক্ষ্যের কথা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ‘কোনো নারী, পুরুষ বা শিশু যেন অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয় থেকে বঞ্চিত না হয়’ তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন।’ দেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষকে এই উন্নয়নযজ্ঞে সম্পৃক্ত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার কোনো অবস্থাতেই নড়চড় হবে না।’ স্বনির্ভরতাকেই তিনি দেশের মূলমন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বলেন, ‘আমাদের সফল হতেই হবে, কারণ আমাদের সামনে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

জিয়াউর রহমানের ভাষণে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী বিষয়টি ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব। আঞ্চলিক শান্তির সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার যোগসূত্র ব্যাখ্যা করে তিনি এ অঞ্চলে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের কাছে কিংবা দূরে যেকোনো ধরনের বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়, যা নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিহীন।’

তিনি বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশ ইতোপূর্বে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে উঠলেও দক্ষিণ এশিয়ায় তখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত এক টেবিলে বসা এবং এ অঞ্চলের মানুষের পারস্পরিক কল্যাণে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করা। দক্ষিণ এশিয়ায় এখন আমাদের যাত্রা শুরু করার সময় এসেছে।’ (যার ধারাবাহিকতায় পরে সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়)।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অসমাপ্ত স্বপ্ন ও কাজগুলোকে পরে এগিয়ে নিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে বেগম খালেদা জিয়া বেশ কিছু মৌলিক ও তাত্পর্যপূর্ণ বিষয়ে আলো ফেলেন। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একে অপরকে শক্তিশালী করে। দারিদ্র্য মোকাবিলার সক্ষমতার ওপরই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করছে।’

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দেন, মূলধনের অভাব ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে বাংলাদেশের একার পক্ষে এত বড় পথ চলা কঠিন। তাই তিনি উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে যখন আমরা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হই, তখন একা এই কঠিন কাজ সম্পাদন করা সম্ভব নয়; আমাদের সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।’

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মানবাধিকার, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ছোট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি দৃঢ়ভাবে যুক্ত করেন। স্নায়যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর অধিকার সুরক্ষায় জাতিসংঘকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর তাগিদ দেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করার মাধ্যমে এক সমৃদ্ধ সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’ ছোট ও বড় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ছোট দেশগুলোর নিরাপত্তা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক আইনের শাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এছাড়া অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সমুদ্র আইন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের মর্যাদার বিষয়গুলোকে তিনি অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।

আজ ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় মধ্য রাতে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম ভাষণে অংশ নিতে যাচ্ছেন। পুরো জাতি আজ গভীর আগ্রহ ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছে—তার পিতার সুচিন্তিত ও দূরদর্শী ভাবনার অনুকরণে বিশ্বমঞ্চে কেমন দিগদর্শন ফুটে ওঠে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন সর্বদা নতুন রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য নিজেদের দূরদৃষ্টি ও দেশের অবস্থান তুলে ধরার সবচেয়ে বড় মঞ্চ।

অতীতে অনেক বিশ্বনেতা প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে এসে পুরো দুনিয়ার সামনে যে ঐতিহাসিক বক্তব্য ও স্বপ্ন তুলে ধরেছিলেন, তা কালক্রমে বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। ঐতিহাসিক এই ধারা প্রমাণ করে—প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে তরুণ ও দূরদর্শী রাষ্ট্রপ্রধানরা যে স্বপ্ন দেখান, তা কেবল নিজ দেশের ভাগ্য নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক রাজনীতির চিন্তা-চেতনাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এদিক থেকে বাংলাদেশ থেকে আজকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি দেশের সামগ্রিক নজর থাকবে, এটিই স্বাভাবিক।

ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান শাসনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক গতিধারা, বৈশ্বিক সংকট, বিশ্বজুড়ে মানবতা ও মানবাধিকারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের এক নতুন দিকনির্দেশনা ফুটে উঠবে তার কণ্ঠে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মা-বাবার রক্ত ও আদর্শের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে ৩১-দফার ভিত্তিতে এক আধুনিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথাই তিনি স্মরণ করিয়ে দেবেন বিশ্বমঞ্চে, বিশ্বনেতাদের।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version