শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫

নিজস্ব প্রতিবেদক: সৎ মায়ের ওপর অভিমান করে বাড়ি ছেড়েছিলেন কিশোরী মেয়ে। আর সেই নিখোঁজ হওয়ার দায় চাপানো হয় প্রতিবেশী এক নিরীহ ব্যক্তির ঘাড়ে। বিষয়টি কেবল অভিযোগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দায়ের করা হয় অপহরণ ও গুমের মতো গুরুতর মামলা। সেই মিথ্যা মামলার ঘানি টানতে গিয়ে বিনা অপরাধে নয়টি মাস কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়েছে এক নিরপরাধ মানুষকে। তবে সত্য কখনো চিরকাল চাপা থাকে না। নিখোঁজ মেয়েটির ফিরে আসা এবং আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অবশেষে সেই নির্দোষ ব্যক্তি শুধু মুক্তিই পাননি, পেয়েছেন কাঙ্ক্ষিত সুবিচারও। মিথ্যা মামলা সাজিয়ে হয়রানির দায়ে এবার খোদ অভিযোগকারী বাবা কেই কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

ঘটনাটি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার গনিয়াগাঁও এলাকার। গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নেত্রকোনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ কে এম এমদাদুল হক চাঞ্চল্যকর এ মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে মিথ্যা মামলা দায়েরকারী মজিবুর রহমানকে (৫৫) দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাকে আরও তিন মাস কারাভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি নুরুল কবীর রুবেল এই রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আদালত ও মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, ঘটনার শুরু ২০২১ সালের শুরুর দিকে। ওই বছরের ২১ জানুয়ারি মজিবুর রহমান তার মেয়েকে অপহরণ ও গুম করার গুরুতর অভিযোগ এনে কলমাকান্দা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলাটিতে আসামি করা হয় একই গ্রামের বাসিন্দা খোকন মিয়াকে (৪৫)।

মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ খোকন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়। এরপর জামিন না পাওয়ায় দীর্ঘ নয় মাস তাকে কারাগারের চার দেয়ালে বন্দি জীবন কাটাতে হয়। পরিবার ও সমাজে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশা।

ঘটনার মোড় ঘোরে যখন মজিবুর রহমানের সেই ‘নিখোঁজ’ মেয়ে একদিন নিজেই সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় বাড়িতে ফিরে আসেন। তিনি সবাইকে জানান, তাকে কেউ অপহরণ বা গুম করেনি। মূলত সৎ মায়ের সঙ্গে পারিবারিক কলহ ও রাগারাগি করেই তিনি স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নিজের মতো করে কাজও জুটিয়ে নিয়েছিলেন।

মেয়েটির স্বীকারোক্তির পরই খোকন মিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি যে পুরোপুরি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। আইনি লড়াই শেষে ২০২৩ সালের ৬ মে আদালত খোকন মিয়াকে ওই মিথ্যা অপহরণ মামলা থেকে সসম্মানে খালাস প্রদান করেন।

বিনা দোষে জেল খাটা এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার তীব্র যাতনা মেনে নেননি ভুক্তভোগী খোকন মিয়া। নিজের ওপর হওয়া অমানবিক অন্যায়ের সুবিচার চেয়ে তিনি পুনরায় আইনের দ্বারস্থ হন। মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দিয়ে হয়রানি করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে পাল্টা মামলা দায়ের করেন তিনি।

আদালত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মামলাটি আমলে নেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় ছয়জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত নিশ্চিত হন, মজিবুর রহমান উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলাটি করেছিলেন। সবশেষে গত বুধবার আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।

আইনজীবীরা মনে করছেন, এই রায় সমাজে একটি বড় বার্তা দিয়ে গেল। ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অন্য কোনো কারণে আইনের অপব্যবহার করে কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করলে, শেষ পর্যন্ত আইন তার নিজের গতিতেই অপরাধীকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসে- এই রায়ের মাধ্যমে সেটিই আবারও প্রমাণিত হলো।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version