নিজস্ব প্রতিবেদক: পারিবারিক কলহ, মানসিক নির্যাতন এবং আপন মা-বাবার বিরুদ্ধে ওঠা চরম ভিত্তিহীন অপবাদের ভার সইতে না পেরে নেত্রকোনার এক তরুণী গৃহবধূ আত্মহননের মতো ভয়ংকর পথ বেছে নিয়েছেন। মৃত্যুর আগে মর্মস্পর্শী ভিডিও বার্তায় তিনি তার করুণ পরিণতির পেছনের কারণগুলো জানিয়ে যান। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়িকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে নেত্রকোনার দুর্গাপুর থানার চারকরিয়া ডহর গ্রামে। নিহত ২২ বছর বয়সী ওই গৃহবধূর নাম জান্নাতুল, তিনি আব্দুস সাত্তারের মেয়ে।
জানা যায়, স্বামী নাঈমের সংসারে গত তিন বছর ধরে জান্নাতুল অনেকটা বন্দিদশার মতো মুখ বুজে মানসিক নির্যাতন সহ্য করে আসছিলেন। স্বামী নাঈম তাকে ভালোবাসলেও, তার ভেতরের ক্ষত বা মানসিক কষ্টগুলো অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন বলে জান্নাতুল তার বার্তায় উল্লেখ করেন।
তবে জান্নাতুলকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে তার মা-বাবার চরিত্র নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকদের তোলা জঘন্য ও ভিত্তিহীন অপবাদ। তার মা-বাবাকে উদ্দেশ্য করে মেয়েদের নিয়ে ব্যবসার মতো অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। চরম এই অপবাদের কারণে সমাজে তাদের মাথা নিচু হয়ে যায় এবং মানুষের কটু কথার তীরে রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও তার পরিবারের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
মানসিক যন্ত্রণার চরম সীমায় পৌঁছে এমন ভিডিও বার্তায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে জান্নাতুল জানান, শ্বশুরবাড়ির জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি গভীর আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়াটাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। অন্যায় ও অপমানের প্রতিবাদ করার মতো কোনো শারীরিক ও মানসিক শক্তি আর তাঁর অবশিষ্ট নেই বলে তিনি জানান।
চরম মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তিনি তার দুই বোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেন যেন তার বোনদের জীবনে কখনো এমন ভয়ানক কষ্ট নেমে না আসে। মা-বাবার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশ করে তিনি বারবার অনুরোধ করেন, তারা যেন তার মৃত্যুর পর কোনোভাবেই ভেঙে না পড়েন বা তার জন্য কান্না না করেন।
ভিডিও বার্তায় জান্নাতুল স্পষ্ট করে বলেন, তার মা-বাবার কোনো দোষ নেই; বরং সমাজে সত্যিকারের বিবেকবান মানুষ থেকে থাকলে, তারা যেন এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার করেন।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ নিহতের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করেছে, যেখানে আত্মহত্যার আগে ধারণকৃত ওই ভিডিও বার্তাটি পাওয়া যায়। এ ঘটনায় বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন- নিহতের স্বামী নাঈম (২৬), তার শ্বশুর কামাল হোসেন (৫২) এবং শাশুড়ি রেহানা (৪৫)। গ্রেপ্তারকৃত সকলের দুর্গাপুরের চারকরিয়া ডহর গ্রামের বাসিন্দা।
ওসি শাকের আরও জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে আত্মহত্যার সময় সকাল অনুমান ১০টা থেকে ১১টার মধ্যবর্তী যেকোনো সময় হতে পারে। উদ্ধারকৃত মরদেহটি ময়না তদন্তের জন্য আগামীকাল (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালের দিকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হবে।
জান্নাতুলের ভিডিও বার্তাটি সমাজে পারিবারিক নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যা প্রমাণ করে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক নির্যাতন এবং মিথ্যা অপবাদও মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে চিরতরে মুছে দিতে পারে।




