বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪

কেন্দুয়া প্রতিনিধি: হাওরের শান্ত জলে তখন বিকেলের নরম রোদ পড়ার কথা, অথচ নদীর দুই তীরে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র হাতে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন প্রায় সাত থেকে আটশ মানুষ। চোখেমুখে ক্ষোভ আর দীর্ঘদিনের জিঘাংসা। তবে মাঝখানে সাইডুলি নদী আশীর্বাদ হয়ে না দাঁড়ালে হয়তো বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বড় ধরনের রক্তপাতেই সাক্ষী হতে হতো নেত্রকোনাবাসীকে।

কেন্দুয়া উপজেলার জালালপুর ও মদন উপজেলার বাসুরি- এই দুই গ্রামের মধ্যকার পুরনো এক বিরোধকে কেন্দ্র করে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এমন চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে বড় কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও হাওরপাড়ের বাতাসে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে চাপা আতঙ্ক আর ভবিষ্যৎ সংঘাতের শঙ্কা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই রণপ্রস্তুতির শুরুটা হঠাৎ করে নয়। হাওরে ঘাস কাটাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে আগে থেকেই শীতল স্নায়ুযুদ্ধ ও দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছিল। বুধবার বেলা ১১টার দিকে সাইডুলি নদীর দেবদুল্লা ঘাট এলাকায় জালালপুর গ্রামের মাছের ঘের কেটে দেয় প্রতিপক্ষ। পুরনো ক্ষোভের আগুনে এই ঘটনা যেন ঘি ঢেলে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই ঘের কাটার খবর ছড়িয়ে পড়ে উভয় গ্রামে।

খবর পেয়ে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে রামদা, বল্লম, টেঁটা ও লাঠিসোঁটাসহ নানা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দুই গ্রামের শত শত মানুষ নদীর দুই তীরে এসে জড়ো হন। দুপুর থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে পাল্টাপাল্টি মহড়া ও উত্তেজনা। মাঝখানে প্রমত্ত সাইডুলি নদী প্রবহমান থাকায় সরাসরি কেউ কারও ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেনি, যার ফলে নিশ্চিত ও ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে রক্ষা পায় দুই গ্রাম।

বিকেলের দিকে দুই গ্রামের স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও বয়োজ্যেষ্ঠদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। উভয় পক্ষকে বুঝিয়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু এই আপাত শান্তির মাঝেই ঘটে ছন্দপতন। উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হওয়ার আগেই বাসুরি গ্রামের একদল অতি-উৎসাহী ও উত্তেজিত ব্যক্তি জালালপুর গ্রামে ঢুকে পড়ে। সেখানে একটি হাঁসের খামারে অতর্কিত হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে তারা। তবে দিনভর উত্তেজনা ও হামলায় সৌভাগ্যবশত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

দিনভর রণপ্রস্তুতি এবং শেষবেলায় খামারে হামলার ঘটনায় হাওরপাড়ের সাধারণ মানুষের মাঝে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রামবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে দুই গ্রামের প্রায় হাজারখানেক মানুষ অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান করলেও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ত্বরিত কোনো পদক্ষেপ সেভাবে চোখে পড়েনি। পুলিশের ধীরগতির ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, “খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও শান্তি বজায় রাখতে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সাময়িকভাবে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো গেলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভের আগুন এখনও নিভেনি। যেকোনো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা পুনরায় বিস্ফোরিত হয়ে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রূপ নিতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও প্রাণহানি এড়াতে অবিলম্বে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে স্থায়ী, কার্যকর ও লিখিত সমঝোতা না হলে হাওরের বাতাসে বারুদের গন্ধ থেকেই যাবে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version