মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২

রুহুল আমিন, ডিমলা (নীলফামারী)

হাসপাতালের নথিতে চিকিৎসক ১৭ জন। কিন্তু নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন ১৩ জন। এর মধ্যে দুজন আবার ডেন্টাল সার্জন। অথচ নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত চিকিৎসক পদের সংখ্যা ৩৩টি। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের অর্ধেকেরও কম চিকিৎসক দিয়ে চলছে ৫০ শয্যার হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা।

আর নথিতে থাকা চার চিকিৎসকের কেউই বর্তমানে ডিমলা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন না। তাঁরা প্রেষণে রয়েছেন অন্যত্র। এ অবস্থায় প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে সীমিতসংখ্যক চিকিৎসককে। ভর্তি রোগীর সংখ্যাও প্রায়ই ১০০ ছাড়িয়ে যায়।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কাগজে থাকা চিকিৎসকদের দিয়ে কি বাস্তবে রোগীর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব?
নথিতে যাঁরা আছেন, হাসপাতালে নেই

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রেষণে অন্যত্র থাকা চার চিকিৎসক হলেন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ইএনটি) ডা. রিপন কুমার সরকার, প্যাথলজিস্ট ডা. নিরঞ্জন কুমার রায়, মেডিকেল অফিসার ডা. মো. সাজেদুর রহমান চৌধুরী এবং সহকারী সার্জন ডা. মৌসুমী বৈষ্ণব।তাঁরা ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত হিসেবে নথিতে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন বলে হাসপাতাল সূত্রের দাবি।

অন্যদিকে, তাঁদের বেতন-ভাতা ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেই উত্তোলন করা হচ্ছে কি না, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি জানতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “অন্য মেডিকেলে দায়িত্ব পালন করে আরেক মেডিকেলের নামে বেতন তুলতে পারেন কি না—এমন হওয়ার কথা নয়।”

১৩ চিকিৎসকের ওপর ৫০ শয্যার হাসপাতাল
বর্তমানে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করা ১৩ চিকিৎসকের মধ্যে দুজন ডেন্টাল সার্জন। বাকি ১১ জন মেডিকেল অফিসার। তাঁদের একজনকে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

প্রতিদিন শত শত রোগীর চাপের বিপরীতে এত অল্পসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন সেবা চালাতে গিয়ে চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি ওয়ার্ডবয় ও আয়ার পদও শূন্য। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন মাত্র একজন। ফলে হাসপাতালের সামগ্রিক সেবা ব্যবস্থাপনাতেও জনবল সংকটের প্রভাব পড়ছে।
শিশু ও নারীর চিকিৎসায় বড় ঘাটতি
ডিমলা হাসপাতালে শিশু ও গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ইএনটি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্টও প্রেষণে অন্যত্র থাকায় নিয়মিত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।
ফলে জটিল রোগী বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন হলে তাঁদের ছুটতে হচ্ছে নীলফামারী সদর কিংবা রংপুরে।

ডিমলা উপজেলা সদর থেকে নীলফামারী সদর হাসপাতাল প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে। প্রত্যন্ত চরাঞ্চল ও নদীভাঙন এলাকার মানুষের জন্য এই দূরত্ব আরও বড় বাধা।
বিশেষ করে অসুস্থ শিশু কিংবা প্রসূতি রোগীকে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে স্বজনদের ভোগান্তি ও ব্যয়—দুটিই বাড়ছে।

টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী গ্রামের কৃষক ওয়াহাব আলী বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। কষ্ট করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। আমরা চাই, সরকারি এই হাসপাতালেই যেন সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়।”

খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের দোহলপাড়া গ্রামের গৃহবধূ লিলি বেগম বলেন, “আমাদের মতো সাধারণ ও গরিব মানুষের রংপুরে গিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। আমরা চাই, সিজারিয়ান অপারেশনসহ ছোট-বড় সব ধরনের অস্ত্রোপচার যেন এই হাসপাতালেই হয়।”
৩ লাখের বেশি মানুষের ভরসা এই হাসপাতাল
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ডিমলা উপজেলায় জনসংখ্যা তিন লাখ ১৬ হাজারের বেশি। উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা, তিস্তা নদীতীরবর্তী চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের সরকারি চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেলে রোগীদের যেতে হয় জেলা সদর বা রংপুরে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি যাতায়াতের খরচও বাড়ে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সেই বাড়তি ব্যয় অনেক সময় চিকিৎসা নেওয়ার পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডা. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, “হাসপাতালে ৩৩টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে চিকিৎসক আছেন ১৭ জন। এর মধ্যে চারজন এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বেতন নিলেও দীর্ঘদিন ধরে অন্যত্র কর্মরত। বর্তমানে হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন ১৩ জন চিকিৎসক। তাঁদের মধ্যে দুজন ডেন্টাল সার্জন। সীমিত জনবল নিয়ে সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”

তবে জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমাদের ডিমলায় বর্তমানে কোনো ডাক্তার সংকট নেই, শুধুমাত্র কনসালট্যান্টের সমস্যা রয়েছে। ৪৮তম বিসিএসের পর আমরা মোটামুটি ডাক্তার পেয়েছি, এখন আমাদের ডাক্তার সংকট নেই।”

দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে চিকিৎসক সংকটের চিত্র নিয়ে ভিন্নতা থাকলেও হাসপাতালের নথি অনুযায়ী ৩৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন ১৭ জন এবং হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন ১৩ জন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পদ শূন্য থাকা এবং প্রেষণে থাকা চিকিৎসকদের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শিশু, গাইনি, ইএনটি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা দ্রুত চালু করা হোক। এতে দূরের হাসপাতালে ছুটতে হবে না রোগীদের।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version