নিজস্ব প্রতিবেদক: “আমার ক্যান্সারে আক্রান্ত শরীর নিয়ে আমি আর কতটুকু দৌড়াব? আমার ছেলটাই তো আমার হাত-পা ছিল। বিদেশ পাঠানোর সব প্রস্তুতি শেষ, টাকাও দেওয়া হয়ে গেছে- অথচ আজ আমার বুক খালি করে কফিনে যেতে হলো তাকে!”- অশ্রুসিক্ত চোখে কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার মদনে নির্মাণাধীন ছাত্রীনিবাসে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ হারানো কলেজছাত্র মারুফ খানের বাবা আশিক খান কপি।
ক্যান্সারে আক্রান্ত অসুস্থ বাবার পাশে থেকে তার ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারি কাজের হাল ধরেছিলেন যে তরুণ, সেই মারুফ খানের (২২) জীবন প্রদীপ নিভে গেল এক দুর্ঘটনায়। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে মদন আদর্শ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ছাত্রীনিবাস ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত মারুফের বাবা আশিক খান কপি মদন আদর্শ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ওই ছাত্রীনিবাস ভবনের সাব-ঠিকাদারের দায়িত্বে ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন তিনি। শারীরিক চরম অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজের দেখাশোনা করা তার পক্ষে সম্ভব হতো না। বাবার অসহায়ত্ব দূর করতে ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী মারুফ নিজেই নেমে পড়েন ময়দানে। নিয়মিত বাবার সঙ্গে সাইটে এসে কাজের তদারকি করতেন তিনি।
ঘটনার দিন সকালেও বরাবরের মতো বাবা-ছেলে একসঙ্গে বিদ্যালয় ভবনটির নির্মাণকাজে যান। কাজ পরিদর্শনের একপর্যায়ে মারুফের নজর কাড়ে ভবনের গ্রীলের সঙ্গে ঝুলতে থাকা অবিন্যস্ত বৈদ্যুতিক তার। অসাবধানতাবশত ওই উন্মুক্ত তারে হাত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন।
ছেলের এমন আকস্মিক বিপদের দৃশ্য দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন ক্যানসার আক্রান্ত বাবা। দ্রুত মেইন সুইচ বন্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন মারুফ; ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
নিহত মারুফ খান মদন পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মদন কান্দাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার মা পপি আক্তার মদন পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবারে এখন চলছে মাতম।
শোকার্ত বাবা আশিক খান কপি আহাজারি করে বলেন, “মারুফই ছিল আমাদের একমাত্র অবলম্বন ও ভবিষ্যতের ভরসা। তাকে বিদেশে পাঠানোর সমস্ত প্রক্রিয়া এবং আর্থিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। অসুস্থ শরীর নিয়ে আমি এখন একা কীভাবে বাঁচব, আমার সংসারটাই বা কীভাবে চলবে?”
ঘটনার পরপরই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় পুলিশ। এ বিষয়ে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন করিম জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে নিহতের পরিবারের পক্ষ কোন অভিযোগ থাকায় মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর এবং থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।
নির্মাণাধীন ভবনে সামান্য অসাবধানতা বা বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ঘাটতি কীভাবে সম্ভাবনাময় এক তরুণের প্রাণ কেড়ে নিল, এই মর্মান্তিক ঘটনা তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে রইল মদনবাসীর মনে।




