কেন্দুয়া প্রতিনিধি: পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশাল জশনে জুলুস ও আলোচনা সভা। বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরের দিকে হাওলাপুরী দরবার শরীফের গদিনীশীন পীর হযরত শাহ্ সুফি মাওলানা আলহাজ সৈয়দ নাঈমুল কুদ্দুছ আকবরী (ম.জি.য়া)-এর সুযোগ্য নেতৃত্বে এবং দরবার-এ গাউছে হাওলা খানকা-এ শিবলী মঞ্জিল-এর ব্যবস্থাপনায় বর্ণাঢ্য এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। আয়োজক ও ভক্তদের দাবি অনুযায়ী, চট্টগ্রামের পর এটিই বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জশনে জুলুস র্যালি, যেখানে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার আশপাশের জেলাগুলো থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সমাগম ঘটে।
যথাযথ মর্যাদা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে আশেকানে রাসুলরা দিনটি উদযাপন করেন। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভাগমনের আনন্দে হাওলাপুরি দরবার শরীফের হাজার হাজার মুরিদান, আশেকান ও ভক্তবৃন্দ সকাল থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে কেন্দুয়া পৌর শহরের চকপাড়াস্থ খানকা শরীফে সমবেত হতে থাকেন।
পরে দুপুরে বিশাল র্যালি বের করা হয়। জশনে জুলুসে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি কালেমা তাইয়্যেবা লেখা পতাকা, সুসজ্জিত ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে নবীর শানে স্লোগান দিতে দিতে কেন্দুয়া বাজারসহ পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় ‘নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার’, ‘নারায়ে রিসালাত-ইয়া রাসুলাল্লাহ’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো কেন্দুয়া শহর। র্যালিতে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে নাতে রাসুল পরিবেশন করা হয়। সুসজ্জিত তোরণ এবং ‘নবী না হয়ে দুনিয়ায়, না হয়ে ফেরেস্তা খোদার…’ সম্বলিত ব্যানারগুলো পুরো শহরের পরিবেশে আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে।
জুলুস শেষে খানকা শরিফ প্রাঙ্গণে মহানবীর স্মরণে বিশেষ আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে হাওলাপুরী দরবার শরীফের গদিনীশীন পীর হযরত শাহ্ সুফি মাওলানা আলহাজ সৈয়দ নাঈমুল কুদ্দুছ আকবরী বলেন, “হযরত মুহাম্মদ (সা.) সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর আদর্শে শান্তি, সাম্য ও মানবতার মহান শিক্ষা রয়েছে। দেশ ও জাতিকে সুশৃঙ্খল করতে এবং সমাজ থেকে পাপাচার ও অসামাজিক কার্যকলাপ দূর করতে রাসূল (সা.)-এর মহব্বত অন্তরে লালন করার কোনো বিকল্প নেই।”
তিনি দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “এই স্বাধীন বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান- প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের নিজ নিজ মতাদর্শ ও ধর্ম প্রচার করবে। কাউকে বাধা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।” যুবসমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে তিনি তরুণদের রাসূল (সা.)-এর আদর্শ ও পীর-আউলিয়াদের দেখানো পথে জীবন পরিচালনার আহ্বান জানান।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি স্থানীয় প্রশাসন- জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং জনপ্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি, স্মৃতিচারণ করে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সাথে রাখা তার প্রতিশ্রুতির কথাও জনসম্মুখে তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী। তিনি বলেছেন, দলমত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জানমালের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে মতাদর্শ প্রচারের অধিকার প্রতিষ্ঠাই তার প্রধান লক্ষ্য। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষ এখানে শান্তিতে বসবাস করবে এবং কোনো বিশৃঙ্খলা হতে দেওয়া হবে না। আগামী ৫ বছর সব ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম থেকে দূরে থেকে সততার সাথে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
জশনে জুলুসে আগত ভক্তদের মাঝে ছিল বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। আগত ভক্ত ও কবি তানভীর জাহান চৌধুরী তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “চট্টগ্রামের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জামায়েত এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের সর্ববৃহৎ জশনে জুলুস এটি। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে হযরত শাহ্ সুফি সৈয়দ নাঈমুল কুদ্দুছ আকবরী হুজুরের নেতৃত্বে আমরা এই দিনটি উদযাপন করে আসছি।”
অপর ভক্ত বদরুজ্জামান খান মহব্বত বলেন, “প্রায় দুই দশক ধরে কেন্দুয়ায় বিশাল র্যালি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি দিন।” গোলাম রব্বানী নামের আরেক ভক্ত জানান, প্রিয়নবীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই তারা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন এই খানকা শরীফে।
অনুষ্ঠান শেষে দেশ ও জাতির সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি, যুবসমাজের হেদায়েত এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করে এক আবেগঘন বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন হাওলাপুরী দরবার শরীফের গদিনীশীন পীর হযরত শাহ্ সুফি মাওলানা আলহাজ সৈয়দ নাঈমুল কুদ্দুছ আকবরী (ম.জি.য়া)। মোনাজাতে হাজার হাজার মানুষের ‘আমিন আমিন’ ধ্বনিতে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়।


